ITR জমা দেওয়ার ডেডলাইন পার? বিশ্বের এমন এক দেশ যেখানে ১৮৬৯ সাল থেকে ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না!

আয়কর রিটার্ন (ITR) ফাইল করা, ফর্ম ১৬ মেলানো আর শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো—প্রতি বছর এই সময়টা কোটি কোটি ভারতীয়র জন্য চরম মানসিক চাপের। কিন্তু ভাবুন তো, পৃথিবীর বুকে এমন একটি দেশ রয়েছে যেখানে বাসিন্দাদের সারা জীবনে এক পয়সাও ব্যক্তিগত আয়কর বা Personal Income Tax দিতে হয় না!

কথা হচ্ছে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত ঝলমলে দেশ মোনাকো (Monaco)-কে নিয়ে। ১৮৬৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশে কোনো ব্যক্তিগত আয়কর নেই। তবে শুধু ‘ট্যাক্স হেভেন’ বা কর ছাড়ের স্বর্গরাজ্য হিসেবেই নয়, রাজকীয় ঐতিহ্য, বিলাসবহুল লাইফস্টাইল আর রোমাঞ্চকর পর্যটনের জন্য বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি রয়েছে এই দেশটির।

১৮৬৯ সাল থেকে কেন আয়কর মুক্ত মোনাকো?
আজ থেকে ১৫০ বছরেরও বেশি আগে, ১৮৬৯ সালে মোনাকোর তৎকালীন রাজা প্রিন্স চার্লস তৃতীয় দেশ থেকে ব্যক্তিগত আয়কর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেন। কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এই অসম্ভব কাজ?

ক্যাসিনোর কামাল: সেই সময় বিখ্যাত ‘মন্টে কার্লো ক্যাসিনো’ (Monte Carlo Casino) থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হতে শুরু করে। ক্যাসিনোর এই আয়ই দেশটির পুরো অর্থনীতি সামলানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

বর্তমান নিয়ম: আজও মোনাকো বেশিরভাগ বাসিন্দার ওপর কোনো আয়কর চাপায় না। তবে ফরাসি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে—ফ্রান্স ও মোনাকোর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীনে তাদের আয়কর দিতে হয়।

অন্যান্য কর: মোনাকোয় আয়কর না থাকলেও সামাজিক সুরক্ষা অবদান, ব্যবসায়িক কর্পোরেট ট্যাক্স এবং ভ্যাট (VAT) চালু রয়েছে।

নজরে রাখার মতো বিষয়: মোনাকোয় গিয়ে বসবাস করলেই কেউ রাতারাতি ট্যাক্স-ফ্রি সুবিধা পান না। এর জন্য কঠোর আইনি, আর্থিক এবং আবাসনের শর্ত পূরণ করতে হয়।

আয়তনের দিক থেকে পিচ্চি, কিন্তু অভিজ্ঞতায় বিশাল!
মাত্র ২ বর্গকিলোমিটারের সামান্য বেশি আয়তনের এই ক্ষুদ্র দেশটি যেন বিলাসিতার খনি। বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও (প্রথম ভ্যাটিকান সিটি) বিশ্বমঞ্চে এর প্রভাব অসামান্য।

মোনাকোর ৬টি সেরা আকর্ষণ, যা মিস করা অসম্ভব:
১. মোনাকো গ্র্যান্ড প্রিক্স (Monaco Grand Prix): ফর্মুলা ওয়ান (F1) রেসিংয়ের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় মোনাকোর সরু রাজপথে।

২. বিশ্ববিখ্যাত মন্টে কার্লো ক্যাসিনো: জুয়া না খেললেও এই ভবনের ‘বেল এপোকে’ (Belle Époque) স্থাপত্যশৈলী দেখার মতো। হলিউডের বহু ব্লকবাস্টার ছবিতে এই ক্যাসিনো দেখানো হয়েছে।

৩. অতুলনীয় বিলাসিতা: ‘পোর্ট হারকিউলিস’-এ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুপার-ইয়াট এবং রাজপথে বিলাসবহুল স্পোর্টস কার মোনাকোর ধনকুবের লাইফস্টাইলের পরিচয় দেয়।

৪. রাজকীয় প্যালেস (Prince’s Palace): শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রিমাল্ডি পরিবারের বাসভবন এটি। রাজপ্রাসাদের রক্ষীদের ঐতিহ্যবাহী ‘গার্ড চেঞ্জিং’ অনুষ্ঠান পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়।

৫. প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর (Le Rocher): মোনাকোর পুরোনো শহরটি সরু পাথুরে রাস্তা, ক্যাফে এবং মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে ঘেরা, যা আধুনিক স্কাইলাইনের সাথে অদ্ভুত এক বৈপরিত্য তৈরি করে।

৬. সমুদ্রবিজ্ঞান মিউজিয়াম (Oceanographic Museum): সমুদ্র সংরক্ষণ ও বিশাল অ্যাকোয়ারিয়ামের জন্য বিশ্বখ্যাত এই মিউজিয়াম পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

মোনাকো সম্পর্কে কিছু অবাক করা তথ্য:
কোটিপতিদের ডেরা: মোনাকোর মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশেরও বেশি মানুষ মিলিওনেয়ার (কোটিপতি)।

দামি রিয়েল এস্টেট: বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল জমির বাজারের তালিকায় মোনাকোর অবস্থান শীর্ষে।

ইউরো ব্যবহার: মোনাকো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সরাসরি সদস্য না হলেও বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে এদের নিজস্ব মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ ব্যবহৃত হয়।

উপসংহার:
ভারতীয়রা যখন আইটিআর ফাইলিংয়ের ডেডলাইন মেলাতে ব্যস্ত, তখন মোনাকোর ‘জিরো ট্যাক্স’ নীতি কিছুটা রূপকথার মতোই মনে হতে পারে। তবে কর ছাড়ের বাইরেও ভূমধ্যসাগরের কোলঘেঁষা এই রূপসী দেশটি ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে জীবনের অন্তত একবার ঘুরে আসার মতো এক স্বপ্নের গন্তব্য!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *