নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস বি-তে বিশ্বের দ্বিতীয় ভারত! অজান্তেই শরীরে বাসা বাঁধছে না তো? বাঁচার উপায় জানুন

বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি-র সংক্রমণে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। দেশে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ এই ক্রনিক ভাইরাসের বাহক। হেপাটাইটিস বি এমন একটি ভাইরাস যা দীর্ঘমেয়াদে ক্রনিক হেপাটাইটিস সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত তা লিভার সিরোসিস, যকৃতের জটিল রোগ কিংবা লিভার ক্যানসারের মতো মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জনদের মতে, এই ভাইরাসের শেষ পর্যায়ের ভয়াবহ পরিণতি হিসেবে সিরোসিস, লিভার ফেলিওর এবং লিভার ক্যানসার (হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা)-এর মতো ঘটনা প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায়।

১. ‘নীরব বাহক’: কেন বছরের পর বছর ধরা পড়ে না এই রোগ?
হেপাটাইটিস বি প্রায়শই একটি নীরব বাহক (Silent Carrier) হিসেবে শরীরে অবস্থান করে এবং বছরের পর বছর ধরে এর কোনো প্রকাশ্য ক্লিনিক্যাল লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না। ভাইরাসটি ধীরে ধীরে লিভারে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে থাকে।

যখন জন্ডিস, ক্লান্তি, অবসাদ বা পেটে জল জমার মতো উপসর্গগুলো স্পষ্ট হয়, ততক্ষণে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত (স্কারিং বা সিরোসিস) হয়ে যায়। চিকিৎসকদের কাছে রোগীরা সাধারণত এই পর্যায়েই প্রথম আসেন, যা রোগী এবং তাঁদের পরিবার উভয়ের জন্যই এক মর্মান্তিক ধাক্কা হয়ে আসে—তখন লিভার প্রতিস্থাপনই একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।

২. পরিবারে ছড়ানোর মারাত্মক ঝুঁকি
রক্ত এবং শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। ভারতে এর সংক্রমণের প্রধান দুটি পথ রয়েছে:

মা থেকে শিশু (Vertical Transmission): এটি ভারতে সবচেয়ে সাধারণ মাধ্যম, যেখানে সংক্রামিত গর্ভধারিণী মা তাঁর নবজাতককে ভাইরাসটি সংক্রমিত করেন।

পারিবারিক সংক্রমণ (Horizontal Transmission): শরীরের বাইরেও এই ভাইরাস প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। পরিবারের মধ্যে শেভিং রেজার, টুথব্রাশ, নখ কাটার মেশিন বা সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার জিনিসপত্র শেয়ার করার মাধ্যমে খুব সহজেই পরিবারের অন্য সদস্যের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

💉 প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাধীন, তবে নিরাময় কঠিন
টিকা গ্রহণ শতভাগ সুরক্ষা প্রদান করতে পারে। ভারত ২০০২ সালে সর্বজনীন টিকাকরণের (Universal Immunisation) আওতায় হেপাটাইটিস বি টিকাকরণ চালু করেছিল। তবে এর আগে জন্ম নেওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রায়শই এই টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছেন।

কেউ পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত হলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন মাত্র একটি ট্যাবলেট—যেমন এনটেকাভির (Entecavir) বা টেনোফোভির (Tenofovir)—খেলে ৯৯ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে ভাইরাসটিকে নিষ্ক্রিয় রাখা সম্ভব। তবে কিছু ওষুধ-প্রতিরোধী ক্ষেত্রও রয়েছে যা ওষুধে সাড়া দেয় না। এই ওষুধগুলো ভাইরাসটিকে পুরোপুরি নির্মূল (Cure) করতে পারে না, কেবল দমন করে রাখে।

🛡️ আপনার করণীয় কী?
ভারতের উচ্চ সংক্রমণের হার বিবেচনা করে ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন এবং হেপাটোলজিস্টরা একটি সাধারণ ও প্রোঅ্যাকティブ পরামর্শ দিয়েছেন:

একবার একটি সাধারণ HBsAg রক্ত পরীক্ষা করান।

রিপোর্ট নেগেটিভ এলে অবিলম্বে টিকা (Vaccination) নিশ্চিত করুন।

রিপোর্ট পজিটিভ হলে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকুন। সচেতনতাই আপনাকে সুস্থ রাখবে এবং অপারেশন থিয়েটারে ট্রান্সপ্লান্ট সার্জনের মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে রাখবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *