“ক্যাম্পাসে ধর্না, মিছিল, পোস্টারিংয়ে নিষেধাজ্ঞা!”-বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের কড়া পদক্ষেপে তুমুল বিতর্ক

ক্যাম্পাসের মধ্যে কিংবা হোস্টেলেও আর করা যাবে না কোনো ধরনের ধর্না, মিছিল, স্লোগান বা পোস্টারিং। কড়া নির্দেশিকা জারি করে এমনটাই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। আর এই নির্দেশ সামনে আসতেই কলেজ চত্বর ছাড়িয়ে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক। পড়ুয়াদের একাংশ কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন।
ঠিক কী কারণে এই নির্দেশিকা?
সূত্রের খবর, সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচিত নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের একাংশের পড়ুয়ারা ১২ ঘণ্টার অনশনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই জল গড়ায় অনেক দূর। এরপরই আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে আলোচনায় বসে কলেজ কর্তৃপক্ষ। আলোচনা পর্বের পরেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করে কলেজ চত্বর এবং হস্টেলে সমস্ত ধরনের মিটিং, মিছিল ও আন্দোলনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি অ্যাডভাইজারি বা নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়।
পড়ুয়াদের একটি বড় অংশের স্পষ্ট দাবি, কলেজ কর্তৃপক্ষের এই একতরফা সিদ্ধান্ত সরাসরি তাঁদের সংবিধানপ্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। এভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চিকিৎসক মহলে দ্বিমত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যমহল দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে:
১. অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টরস-এর তীব্র নিন্দা:
এই সংগঠনের সম্পাদক ডা. উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজ কর্তৃপক্ষের এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, “বর্ধমান মেডিক্যালে ক্যাম্পাসে বা হোস্টেলে কোথাও শান্তিপূর্ণভাবেও মিটিং, মিছিল বা অবস্থান করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। এটি সরাসরি সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারার পরিপন্থী, যা আমাদের বাকস্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের অধিকার দেয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, রাজ্যের একাধিক মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল ও সুপারদের ওপর এই ধরনের নির্দেশ চাপানো হচ্ছে। অবিলম্বে এই আদেশ প্রত্যাহার না হলে বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দরবারে তুলে ধরা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
২. ন্যাশনাল মেডিকোজ অর্গানাইজেশন (NMO)-র সমর্থন:
অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপের পাশে দাঁড়িয়েছে এনএমও। সংগঠনের ডা. রুদ্রনীল নন্দী বলেন, “আমরা সবসময় বলি শিক্ষাঙ্গন বা মেডিক্যাল কলেজগুলিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। সেখানে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল হলে পঠনপাঠনের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে, আর সবচেয়ে বড় কথা—হাসপাতাল চত্বরে আন্দোলন হলে সাধারণ রোগী পরিষেবা মার খায়। তাই আমরা এর পক্ষেই।” তবে পড়ুয়াদের সুবিধার কথাও মাথায় রেখে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা সংঘাতে না গিয়ে প্রিন্সিপাল বা এমএসভিপি (MSVP)-র সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া উচিত।
সবমিলিয়ে, রোগীর পরিসেবা ও পঠনপাঠনের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার যুক্তিতে প্রশাসন কড়াকড়ি বাড়ালেও, বাকস্বাধীনতা ও প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এই নির্দেশিকা ঘিরে তরজা এখন তুঙ্গে।