নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে কড়া নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের! কোন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন্দ্রের কাছে জবাব তলব করল শীর্ষ আদালত?

চলতি দেশের অত্যন্ত আলোচিত ও সংবেদনশীল নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং বিভিন্ন অনিয়মকে কেন্দ্র করে চলা তীব্র বিতর্কের আবহে বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হলো। সুপ্রিম কোর্ট এই সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার শুনানি গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ (NTA)-কে নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ও সামগ্রিক অনিয়মের বিষয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত হলফনামা আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনার পর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার সাধনের জন্য যে সমস্ত সুপারিশ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে ঠিক কতখানি অগ্রগতি হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।

১০টি প্রধান ক্ষেত্রে উত্তর তলব করল শীর্ষ আদালত

আজকের শুনানিপর্বে বিচারপতি পি.এস. নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, সরকারের পক্ষ থেকে কেবলমাত্র কোনো ধরনের অস্থায়ী বা তড়িঘড়ি ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না। পরীক্ষার স্বচ্ছতা চিরতরে বজায় রাখতে একটি দীর্ঘমেয়াদী, মজবুত এবং অত্যন্ত টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিট সংক্রান্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির সমস্ত সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে। আদালত ডিজিটাল পরিকাঠামো উন্নয়ন, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D), প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং মানবসম্পদ বা এইচআর (HR)-এর মতো মোট ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বিশদ জানতে চেয়েছে। এ ছাড়াও, প্রস্তাবিত পরিচালনা পর্ষদ গঠন, বিশেষায়িত ইউনিট তৈরি এবং পরীক্ষার নিরাপত্তা ও নিখুঁত সতর্কতার জন্য সদ্য নিযুক্ত নতুন অতিরিক্ত মহাপরিচালকদের (ADG) সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ও কার্যাবলী কী হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত জবাব তলব করা হয়েছে।

পরীক্ষার তিনটি পর্যায় ও রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনা

সুপ্রিম কোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াটিকে মোট তিনটি ভাগে ভাগ করেছে— যথা পরীক্ষার আগের পর্যায়, পরীক্ষা চলাকালীন সময় এবং পরীক্ষা-পরবর্তী পর্ব। এই প্রতিটি ধাপে কী ধরনের কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সংস্কার আনা হয়েছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থা-প্রতিবেদন (Status Report) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে পরীক্ষার সামগ্রিক পদ্ধতি, একাধিক সেশনে পরীক্ষা নেওয়ার সম্ভাবনা, পরীক্ষার কেন্দ্র নির্বাচন, প্রশ্নপত্র তৈরি, তার নিরাপদ মুদ্রণ ও পরিবহন ব্যবস্থা, কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা বা সিবিটি (CBT) পদ্ধতি গ্রহণের প্রস্তাব এবং তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও জেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, সেই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও আদালত তলব করেছে।

“বিমান বাহিনীর মোতায়েন কেবল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল”

আজকের শুনানির সময় বিচারপতি নরসিমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক মন্তব্য করে জানান যে, অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর তা কঠোরভাবে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় বিমান বাহিনী বা আইএএফ (IAF)-কে যে মাঠে নামানো হয়েছিল, তা আদতে কেবলই একটি সাময়িক ও জরুরি ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি কোনোভাবেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে না। পাশাপাশি, পরীক্ষার্থীদের সঠিক ও স্বচ্ছ পরিচয় যাচাই করার জন্য ‘ডিজিযাত্রা’-র মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও আদালত পরিষ্কার ব্যাখ্যা চেয়েছে।

আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানিপর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত বিজ্ঞ সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে জানান যে, আদালতের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। এই মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে আগামী সোমবার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *