প্রহরীর বন্দুক ছিনিয়ে ব্যারাকে এলোপাথাড়ি গুলি! মালদায় বিএসএফ ক্যাম্পে সহকর্মীদের রক্তে ভাসাল বিচারাধীন জওয়ান

সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) অন্দরে এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী কাণ্ড। কোর্ট মার্শালের বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন বিএসএফের হেফাজত থেকেই প্রহরীর রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে ব্যারাক লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর অভিযোগ উঠল এক বিচারাধীন জওয়ানের বিরুদ্ধে। এই ভয়াবহ হামলায় ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন তিন বিএসএফ জওয়ান। দ্রুত তাঁদের মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা দু’জনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অপর এক জওয়ানের অবস্থা এখনও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মালদার বৈষ্ণবনগরে বিএসএফের হেডকোয়ার্টারে ঘটা এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গোটা সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। খোদ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই কীভাবে একজন বিচারাধীন জওয়ান প্রহরীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলেন, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ঠিক কী ঘটেছিল বৈষ্ণবনগরের বিএসএফ ক্যাম্পে?
জেলা পুলিশের প্রেস বিবৃতি সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত জওয়ানের নাম শিবম কুমার মিশ্র। একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের জেরে তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোর্ট মার্শালের প্রক্রিয়া চলছিল। সেই কারণেই তাঁকে বৈষ্ণবনগরের বিএসএফ হেড কোয়ার্টারে কড়া নিরাপত্তার চাদরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সন্ধেয় আচমকাই কর্তব্যরত এক প্রহরীর কাছ থেকে রাইফেলটি ছিনিয়ে নেন শিবম। এরপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনি পাশের ব্যারাক লক্ষ্য করে পরপর গুলি চালাতে শুরু করেন। হঠাৎ গুলির শব্দে গোটা ক্যাম্পে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে বাকি জওয়ানরা ছোটাছুটি শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিন বিএসএফ সদস্য— অজয় কুমার, অম্বদর সুরেশ এবং ব বিকাশ ব্রহ্ম।

জখমদের উদ্ধার ও অভিযুক্তকে আটক
গোটা ক্যাম্প যখন স্তব্ধ, ঠিক তখনই গুলির শব্দ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন অন্য জওয়ানরা। তাঁরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অভিযুক্ত শিবম কুমার মিশ্রকে নিরস্ত্র করে পাকড়াও করেন। এর পর গুরুতর জখম অবস্থায় তিন জওয়ানকে তড়িঘড়ি মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা অজয় কুমার ও অম্বদর সুরেশকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, গুরুতর জখম বিকাশ ব্রহ্ম বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বৈষ্ণবনগরের বিএসএফ সদর দফতরে নিরাপত্তা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও রাতভর বিএসএফের উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও জেলা পুলিশের আনাগোনা লেগেই ছিল।

পুলিশের তদন্ত ও মানসিক অবসাদের তত্ত্ব
জেলা পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ঘটনার উচ্চপর্যায় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। কী সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই রক্তক্ষয়ী হামলা ঘটল, অভিযুক্ত জওয়ান কীভাবে প্রহরীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিলেন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না—সব দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের জোরালো অনুমান, অভিযুক্ত জওয়ান তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তবে কেবল মানসিক অবসাদই এই হামলার একমাত্র কারণ কি না, তা খতিয়ে দেখতে তাঁর সাম্প্রতিক আচরণ, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং কোর্ট মার্শালের নথিপত্র ঘেঁটে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে ঠিক কোন অপরাধের অভিযোগে শিবম কুমার মিশ্রের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল চলছিল, সেই বিষয়ে এখনও মুখ খুলতে নারাজ বিএসএফ কর্তারা। তদন্তের স্বার্থেই বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আজ, শুক্রবার নিহত দুই জওয়ানের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হবে মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁদের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই জওয়ানদের শরীরে ঠিক কতগুলি গুলি লেগেছিল এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ কী, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা মিলবে। দেশের সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি বাহিনীর সদর দফতরের অন্দরে এমন রক্তাক্ত ও মর্মান্তিক ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই বাহিনীর মানসিক স্বাস্থ্য এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *