কুণালের জন্য মুখ খুললেন, অথচ কল্যাণের বেলায় চুপ মমতা! তবে কি দূরত্ব বাড়াতে চাইছেন তৃণমূল সুপ্রিমো?

বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ও টানাপোড়েনের জেরে দলটি এখন একাধিক শিবিরে বিভক্ত। এই ‘আসল-নকল’ বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আবহের মাঝেই সংসদের বাদল অধিবেশন থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন শ্রীরামপুরের অভিজ্ঞ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে, রাজ্যের বিধানসভা থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন কুণাল ঘোষ।

কিন্তু এই দুই ঘটনার পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যেভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, তা নিয়েই এখন রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। প্রশ্ন উঠছে—তবে কি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে একঘরে বা ছেঁটে ফেলতে চাইছেন খোদ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে দুই নেতার প্রকাশ্য মতপার্থক্যই কি তবে সম্পর্কের এই ভাঙনের মূল কারণ?

কুণালের জন্য বার্তা, কিন্তু কল্যাণের বেলায় নীরবতা
কুণাল ঘোষের সাসপেনশনের ঠিক কিছুক্ষণ পরেই দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন এবং একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট করে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। অথচ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা থেকে সাসপেন্ড হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। আর এখানেই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। তবে কি ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে বক্তব্য রাখা নিয়ে দলনেত্রীর সঙ্গে প্রকাশ্যে বাদানুবাদ এবং তারপর নেত্রীর বিরুদ্ধে মুখ খোলাই মমতার বিরাগভাজন হওয়ার একমাত্র কারণ?

এই প্রসঙ্গে ঋতব্রত পন্থী তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন, “বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এর কোনো সঠিক ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। তবে কল্যাণদার আগের দিনের মিডিয়ার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছিল তিনি ভীষণভাবে আহত এবং দুঃখ পেয়েছেন। তিনি দলের কাছে প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন না বলেই মনে করছেন। এই মানসিক ক্ষোভের জন্যই এমনটা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।”

অতীতে মমতার পাশে থাকলেও বর্তমানে দূরত্ব?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যখন দলের বহু নেতা নানা দিকে পা বাড়িয়েছিলেন বা আলাদা শিবির তৈরি করেছিলেন, তখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবেই পাশে ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিরোধ একসময় প্রকাশ্যে এসেছিল, তবুও তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি।

কিন্তু এবারের একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে বক্তব্য রাখা নিয়ে দলের অন্দরেই মমতা ও কল্যাণের মধ্যে প্রকাশ্যেই বাদানুবাদ ঘটে। সেখানে শ্রীরামপুরের সাংসদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি ‘দিদি’কে ভালোবাসেন, কিন্তু দলনেত্রীকেও কর্মীদের আবেগ বুঝতে হবে, নতুবা দল ধ্বংস হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, ওই মঞ্চের ক্ষোভের রেশ ধরেই কি তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করলেন?

দলের অন্দরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি মুখ না খুললেও, কালীঘাট পন্থী তৃণমূলের অন্য নেতারা অবশ্য কল্যাণের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। কুণাল ঘোষ ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন যে সংসদে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা মন্তব্য ১০০ শতাংশ সঠিক। পাশাপাশি, সাংসদ মহুয়া মৈত্রও কল্যাণের সাসপেনশনকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

তৃণমূলের অন্দরে এই মান-অভিমানের পালা এবং মমতা-কল্যাণের সম্পর্কের শীতলতা কি নিছকই সাময়িক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে বড় কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ? সেই উত্তর দেবে সময়ই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *