দিল্লির আন্দোলনে ছাত্রদের ভিলেন বানাচ্ছে মিডিয়া! ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি

দিল্লির উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়ে এবার জোরালোভাবে সোচ্চার হয়েছেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে অ্যাংমো। মূলধারার সংবাদমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’ (X)-এ এক বার্তায় গীতাঞ্জলি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। রাজধানী শহরের অন্য কোথাও যদি বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তার দায় উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া এই ছাত্র আন্দোলনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই অনুচিত।

“মিডিয়ায় ছাত্রদের কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে”
শিক্ষার্থীদের সমর্থনে ক্ষোভ প্রকাশ করে গীতাঞ্জলি অ্যাংমো লিখেছেন, “একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হতে দেখা আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে চলছে। দিল্লির অন্যত্র যদি সহিংসতার কোনো খবর পাওয়া যায়, তবে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া সেই ঘটনাকে এই আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার তাড়াহুড়ো করবেন না।” তিনি আরও জানান, যাঁরা এই তরুণ আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে চেনেন, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন যে এরা কতটা ধৈর্য, শাসন ও সংযমের পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।

‘সিস্টেমে’র প্রতি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন শিক্ষাবিদের
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তুলে গীতাঞ্জলি লেখেন, “আমি প্রায়শই ভেবে অবাক হই—এটা কেমন এক ব্যবস্থা, যা নিজের দেশের শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস করতে এত ইতস্তত করে? তরুণদের মনের কথা বা ক্ষোভ শোনার চেয়ে তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কেন এত সহজ হয়ে উঠল?” তিনি জোরালো কণ্ঠে আরও বলেন, “আমাদের সন্তানতুল্য এই তরুণদের রক্ষা করা উচিত, সংবাদমাধ্যমে বা সমাজে তাঁদের ভিলেন হিসেবে তুলে ধরা একেবারেই কাম্য নয়। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর তৈরি করা মনগড়া গল্পের ভিড়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর যেন হারিয়ে না যায়, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা ও বোঝা প্রয়োজন।”

লাইমলাইটে উঠে আসা এক অদম্য নারী: কে এই গীতাঞ্জলি অ্যাংমো?
“সোনম যদি রবিবারের সংসদ অভিযানে অংশ নিতে না পারেন, তবে তাঁর জায়গায় আমি নিজে দাঁড়িয়ে সেই মিছিলের নেতৃত্ব দেব”—যন্তর মন্তর থেকে লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে দিল্লি পুলিশ জোর করে তুলে নেওয়ার পর এভাবেই গর্জে উঠেছিলেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। এতদিন প্রচারের আড়ালে থাকলেও, স্বামীর আন্দোলনের উপর এই সরকারি হস্তক্ষেপের পর তিনি এখন লাইমলাইটে এবং রীতিমতো ফ্রন্টফুটে এসে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন।

শিক্ষাগত ও কর্মজীবন: ওড়িশার বালাসোরের এক পাঞ্জাবি পরিবারে জন্ম গীতাঞ্জলির। ফিজিক্সে বিএসসি এবং পরবর্তীতে ভুবনেশ্বর থেকে এমবিএ করার পর প্রায় ১৫ বছর তিনি ডেনমার্কে কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করেছেন। ভারতে ফিরে একটি শিক্ষা সম্মেলনে সোনমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ২০১৭ সালে দু’জনে মিলে গড়ে তোলেন ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস লাদাখ’ (HIAL)। এই সংস্থাটি লাদাখের কঠিন পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব ও সৌরচালিত প্রযুক্তির মাধ্যমে নানা সমস্যার সমাধান করে। এমনকি ২০২১ সালে ভারতীয় সেনার জন্য সৌরচালিত তাঁবুও তৈরি করেছিলেন তাঁরা।

বহুমুখী প্রতিভা: গীতাঞ্জলির পরিচিতি শুধু সোনমের স্ত্রী হিসেবেই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্বও বেশ চমকপ্রদ। তিনি একাধারে ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট এবং ওড়িশি ও রাশিয়ান ব্যালে নাচের পারদর্শী নৃত্যশিল্পী। তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘চেশনিং স্কলার’ (Chevening Scholar) এবং ভারত সরকারের ‘উইমেন ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া’ পুরস্কার বিজয়ী। ব্যবসার পাশাপাশি ‘হেলিপোস বুকস’ নামে তাঁর একটি প্রকাশনা সংস্থাও রয়েছে।

সংগ্রামের ইতিহাস: এটিই প্রথম নয়, এর আগেও যখন লাদাখে আন্দোলনের জেরে সোনম ওয়াংচুককে কড়া জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (NSA) যোধপুর জেলে ১৭০ দিন বন্দি রাখা হয়েছিল, তখন আইনি লড়াই লড়েছিলেন গীতাঞ্জলিই। সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে এবং রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখে তিনি স্বামীর মুক্তি নিশ্চিত করেছিলেন।

চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে যখন নিট (NEET) প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে সোনম অনশন শুরু করেন, গীতাঞ্জলি প্রথমে সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখে স্বামীকে সমর্থন করলেও, বর্তমানে স্বামীর শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি সরাসরি আন্দোলনের প্রথম সারিতে চলে এসেছেন।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *