মাথাব্যথা বা ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে কি সাধারণ চাপ ভাবছেন? হতে পারে এটি ব্রেন টিউমারের প্রথম সতর্কবার্তা!

কাজের শেষে তীব্র মাথাব্যথা, চাবি কোথায় রেখেছেন তা ভুলে যাওয়া, কিংবা হঠাৎ মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া— আধুনিক জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বলেই ধরে নেন বেশিরভাগ মানুষ। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ বা নিরীহ লক্ষণগুলিই অনেক সময় মস্তিষ্কে বাসা বাঁধা টিউমারের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে। সমস্যার মূল বিষয় হলো, ব্রেন টিউমার সাধারণত নাটকীয়ভাবে শুরু হয় না। এর লক্ষণগুলি এতটাই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় যে, দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করার আগে মানুষ সেগুলিকে স্ট্রেস, বার্ধক্য বা ক্লান্তি বলেই ভুল করে বসেন।

২২ জুলাই, ২০২৬ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ব্রেন দিবস ২০২৬’ (World Brain Day 2026)। এই বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় বা থিম হলো— “Brain Health: Access for All” (মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য: সকলের জন্য অধিকার)। বিশ্ব নিউরোলজি ফেডারেশনের (WFN) এই থিমের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং উন্নত মানের স্নায়ুরোগ সংক্রান্ত চিকিৎসা সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কারণ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩.৪ বিলিয়ন মানুষ স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধকতার অন্যতম প্রধান কারণ।

ব্রেন টিউমারের ৫টি প্রাথমিক ও প্রধান সতর্কবার্তা
জনগণের সাধারণ ধারণার বিপরীতে, ব্রেন টিউমার মানেই সবসময় তীব্র মাথাব্যথা বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া নয়। টিউমারের আকার, অবস্থান, বৃদ্ধির হার এবং প্রকারভেদের ওপর এর লক্ষণগুলি নির্ভর করে। রাঁচির মণিপাল হসপিটালের নিউরোসার্জন ডা. বিক্রম সিং-এর মতে, এই প্রাথমিক লক্ষণগুলি সময়মতো চিনতে পারলে চিকিৎসার ফলাফলে অনেক বড় তফাত গড়ে উঠতে পারে:

ক্রমাগত বা তীব্র হতে থাকা মাথাব্যথা: সব মাথাব্যথা ব্রেন টিউমারের লক্ষণ নয়। তবে যে মাথাব্যথা ক্রমশ ঘন ঘন হয় বা তীব্রতা বাড়ে, বিশেষ করে যার সঙ্গে বমি ভাব বা বমি থাকে, তা চিকিৎসকের নজরে আনা জরুরি। রাতের দিকে মাথার অভ্যন্তরে চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় টিউমারজনিত মাথাব্যথা সাধারণত সকালের দিকে বেশি তীব্র হয় অথবা গভীর ঘুম থেকেও মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারে।

প্রথমবার খিঁচুনি (Seizure): যাঁদের আগে কখনও মৃগী বা এিপ্লেসির সমস্যা ছিল না, হঠাৎ করে তাঁদের এই ধরনের খিঁচুনি হওয়া অন্যতম বড় একটি রেড ফ্ল্যাগ। টিউমার মস্তিষ্কের আশেপাশের টিস্যুতে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করলে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে এই খিঁচুনি দেখা দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন প্রথম খিঁচুনি দেখামাত্রই অবিলম্বে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

স্মৃতিভ্রম, বিভ্রান্তি বা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন: সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখতে সমস্যা হওয়া, অতিরিক্ত ভুলে যাওয়া, মেজাজ বদল, খিটখিটে স্বভাব বা আচরণে পরিবর্তন— এগুলি সাধারণত স্ট্রেস বা বার্ধক্যের কারণে ঘটে বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু টিউমার মস্তিষ্কের যে অংশ স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সেখানে প্রভাব ফেললে এমন লক্ষণ দেখা দেয়। মজার বিষয় হলো, আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বোঝার আগে পরিবারের সদস্যরাই প্রথম এই পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করেন।

দৃষ্টিশক্তি বা কথা বলার সমস্যা: ঝাপসা দেখা, দ্বিগুণ দেখা (Double vision), পড়তে সমস্যা হওয়া, পাশের জিনিস দেখতে না পাওয়া বা হঠাৎ সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হওয়া— এগুলি দৃষ্টি ও ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের অংশে চাপের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই এমন সমস্যা দেখা দিলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।

দুর্বলতা, অসাড়তা এবং ভারসাম্যের অভাব: ব্রেন টিউমার মস্তিষ্কের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে হাত বা পায়ে দুর্বলতা, অসাড়তা, শরীরের সমন্বয়হীনতা বা ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা সোজা হয়ে হাঁটার মতো সাধারণ রুটিন কাজগুলিও ধীরে ধীরে কঠিন ঠেকতে পারে।

ব্রেন টিউমারের কারণ ও আধুনিক চিকিৎসা
বেশভাগ ব্রেন টিউমারের সঠিক কারণ এখনও অজানা। কিছু ক্ষেত্রে এগুলি জিনগত বা অতীতে আয়নাইজিং রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে যুক্ত হলেও, অনেক ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণ ছাড়াই এগুলি হতে পারে। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে বয়স বা জীবনযাত্রার ধরন নির্বিশেষে যে কেউ ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হতে পারেন।

বর্তমানে টিউমারের অবস্থান, আকার, প্রকার এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা নির্ধারিত হয়। অস্ত্রোপচার বা সার্জারিই অনেক ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশেষ করে যেগুলি নিরাপদে অপসারণ করা সম্ভব। এর পাশাপাশি চিকিৎসকরা পরিস্থিতি অনুযায়ী রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক থেরাপি (Targeted therapy) বা ইমিউনোথেরাপির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। নিউরো-নেভিগেশন সিস্টেম, অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ এবং ন্যূনতম আক্রমণাত্মক অস্ত্রোপচারের (Minimally invasive surgery) মতো আধুনিক প্রযুক্তির ফলে ব্রেন টিউমার সার্জারি এখন অনেক বেশি নির্ভুল ও নিরাপদ হয়েছে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?
ডা. বিক্রম সিং পরামর্শ দেন যে স্নায়বিক লক্ষণগুলি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও খারাপ হতে থাকে অথবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একটি নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষার পাশাপাশি এমআরআই বা সিটি স্ক্যানের মতো ইমেজিং টেস্টের মাধ্যমে অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব।

বিশ্ব ব্রেন দিবস ২০২৬-এর এই দিনে বার্তাটি স্পষ্ট—সচেতনতাই জীবন বাঁচাতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয় কেবল চিকিৎসার সুযোগই বাড়ায় না, বরং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা, স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদী জীবনের মান রক্ষা করার সম্ভাবনাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *