পুরীর রথযাত্রা শুরু: কেন সোনার ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করেন রাজা? জানুন নেপথ্যের আবেগ!

পুরী: দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম, জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে মুখরিত আকাশ-বাতাস—শুরু হলো ওড়িশার পুরীর ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ রথযাত্রা। আজ ১৬ জুলাই শ্রীমন্দির থেকে বড়দণ্ড দিয়ে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবী। তবে এই রথযাত্রার সমস্ত জাঁকজমক আর আয়োজনের মাঝেও ভক্তদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় এবং আবেগময় মুহূর্ত হলো রাজা কর্তৃক রথের রাস্তা পরিষ্কার করার প্রাচীন রীতি—’ছেরাপহরা’।

কী এই ‘ছেরাপহরা’ রীতি?
রথ টানার ঠিক আগে পুরীর গজপতি মহারাজা বা রাজপরিবারের কোনো প্রতিনিধি এই পবিত্র আচার পালন করেন। সুদৃশ্য ও সুসজ্জিত রথগুলির সামনে মহারাজাকে দেখা যায় সোনার হাতলযুক্ত একটি বিশেষ ঝাড়ু নিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে। ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি রাস্তায় পবিত্র জলও ছিটানো হয়। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং শঙ্খধ্বনির মধ্যে দিয়ে যখন রাজা নিজের হাতে পথ পরিষ্কার করেন, তখন উপস্থিত লক্ষ লক্ষ ভক্তের আবেগ যেন বাঁধনহারা হয়ে ওঠে।

কেন পালিত হয় এই বিশেষ প্রথা?
হিন্দি শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সোনা পবিত্রতা এবং ঐশ্বর্যের প্রতীক। ঈশ্বরের এই মহাযাত্রার শুরুতে রাজার হাতে সোনার ঝাড়ু দিয়ে পথ পরিষ্কার করা প্রভু জগন্নাথের প্রতি চরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই আচারের গভীর তাৎপর্য কেবল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় সীমাবদ্ধ নয়।

সমতা ও বিনয়ের অনন্য বার্তা:
‘ছেরাপহরা’ রীতির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা দেওয়া হয়। রাজা, যিনি রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, তিনিও ঈশ্বরের চরণে সেবক মাত্র। নিজের হাতে রাস্তা পরিষ্কার করে মহারাজা প্রমাণ করেন যে, পরমেশ্বরের কাছে রাজা বা প্রজা, ধনী বা দরিদ্র—সবাই সমান। ক্ষমতার অহংকার নয়, বরং বিনয় এবং নিঃস্বার্থ সেবাই যে প্রকৃত মহানুভবতার পরিচয়, তা এই রীতির মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে প্রচার করা হয়।

ভক্তদের বিশ্বাস:
পুরীর রথযাত্রা উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভক্তি এবং সমর্পণের মেলবন্ধন। লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস, রথের দড়ি টানার পাশাপাশি এই ‘ছেরাপহরা’র সাক্ষী থাকতে পারা পরম ভাগ্যের বিষয়। এটি ভক্তদের শেখায় যে, জীবনের সমস্ত আড়ম্বর সরিয়ে রেখে কীভাবে ঈশ্বরের চরণে বিনম্র চিত্তে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়।

প্রতিবছরের মতো এবারও রথযাত্রার এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত পুরীর আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে দিল ভক্তি ও সাম্যের বার্তা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *