পুরুষতান্ত্রিকতার নতুন রূপ! জেন-জেড প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যেও কেন রয়ে গেছে সেই পুরনো মানসিকতা?

‘প্যাট্রিয়ার্কি’ বা পিতৃতন্ত্র শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পিতার শাসন’। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন মনে করি সমাজ আধুনিক হয়েছে, তখনই প্রশ্ন ওঠে—পুরুষতান্ত্রিকতার শিকড় কি সত্যিই আলগা হয়েছে, নাকি তা নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছে? জেন-জেড (Gen Z) প্রজন্মের বহু পুরুষের চিন্তাভাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পিতৃতন্ত্র আজও সমান সক্রিয়, কেবল তার ভাষা বদলেছে।
লিঙ্গবৈষম্য কি সহজাত, নাকি চাপিয়ে দেওয়া?
আমাদের সমাজব্যবস্থায় লিঙ্গ ভূমিকা (Gender Roles) তৈরি হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। জন্মের পর থেকেই ছেলেদের শেখানো হয় আত্মবিশ্বাসী, নেতা বা শক্তিশালী হতে, আর মেয়েদের শেখানো হয় যত্নশীল, গৃহমুখী এবং নমনীয় হতে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রচার করা হয়, যাতে পরিবার থেকে রাজনীতি—সর্বত্র পুরুষের আধিপত্য বজায় থাকে।
দৈনন্দিন জীবনে বৈষম্যের রেশ:
আমাদের চারপাশে তাকালেই এর স্পষ্ট নিদর্শন মেলে:
বেতনের বৈষম্য: সমান যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের আয়ের পার্থক্য আজও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গৃহস্থালির প্রত্যাশা: অফিস থেকে ফেরার পরও রান্নাবান্না ও সন্তানের দায়িত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর ওপর বর্তায়।
পিং ট্যাক্স: নিত্যপ্রয়োজনীয় নারী-কেন্দ্রিক পণ্যের বাড়তি দাম বা ‘পিংক ট্যাক্স’-এর মতো অঘোষিত বোঝা বহন করতে হয় নারীদের।
নিরাপত্তার দোহাই: সূর্যাস্তের পর বা অন্ধকার গলিতে একা চলাচলে নারীদের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়—যা তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নামান্তর।
‘আদর্শ নারী’ হওয়ার অদৃশ্য চাপ:
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আজও চায় নারী তার স্বামীর অনুগত থাকুক। স্বাধীনচেতা নারীকে অনেক ক্ষেত্রেই ‘অস্বাভাবিক’ মনে করা হয়। এমনকি যৌনতার ক্ষেত্রেও নারী যদি নিজেই উদ্যোগী হয়, তবে সমাজ তাকে বাঁকা চোখে দেখে। সংসার সামলাতে গিয়ে ক্যারিয়ার বিসর্জন দেওয়াটা যেন আজও নারীর জন্য অলিখিত নিয়ম।
আর্থিক স্বাধীনতা এবং পুরুষদের ‘নিরাপত্তাহীনতা’:
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অনেকের কাছেই ঈর্ষার কারণ। অনেকে যখন বলেন, “নারীরা কি সব কিছু ৫০-৫০ ভাগ করবে?”—তখন তারা ভুলে যান যে, মাতৃত্বের যন্ত্রণা বা সন্তানের লালন-পালনের নীরব দায়িত্ব কখনোই ৫০-৫০ হয় না। যখন একজন নারী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন পুরুষদের তথাকথিত ‘প্রোভাইডার’ বা ‘উপর্জনকারী’ ভূমিকাটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এখানেই জন্ম নেয় নিরাপত্তাহীনতা। যারা নিজেকে আধুনিক দাবি করেন, তারাও অনেক সময় সমান দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে গিয়ে পিছিয়ে যান।
উপসংহার:
সমানাধিকার মানেই কি সব কিছু নিজেকে একা করা? একেবারেই নয়। সমানাধিকার মানে ভারসাম্য—যেখানে একে অপরের সহযোগী হয়ে ওঠা যায়। একজন স্বাবলম্বী নারী জানেন যে, তার জীবনে পুরুষের উপস্থিতি বা অর্থ কোনোটিই অপরিহার্য নয়; বরং তা কেবলই একটি পছন্দ। আর এই আত্মবিশ্বাসই হলো সেই অস্ত্র, যা পিতৃতন্ত্রের ভিতে ফাটল ধরাতে পারে।
মনে রাখবেন, কোনো নিরাপত্তাহীন পুরুষের ইগো বা চিন্তাভাবনা নিয়ে তর্ক করার চেয়ে নিজের শান্তি বজায় রাখা অনেক বেশি জরুরি। আর্থিক স্বচ্ছলতা কেবল বিলাসিতা নয়, এটি সেই শান্তি কেনার সামর্থ্য, যা আপনাকে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর নিগড় থেকে মুক্তি দেয়।