ধূমপান ছাড়াতে নতুন পথ! নিউ জিল্যান্ডের মডেলে কি ভারতেরও নীতি বদলের সময় এসেছে?

বিশ্বজুড়ে ধূমপানের মরণফাঁদ থেকে বেরোনোর উপায় নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। সম্প্রতি চিকিৎসা বিষয়ক বিখ্যাত জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা নিউ জিল্যান্ডের ধূমপান বিরোধী লড়াইয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথাগত ধূমপান বিরোধী পদক্ষেপের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ‘লো-রিস্ক’ নিকোটিন বিকল্প ব্যবহারের ফলেই দেশটিতে ধূমপানের হার দ্রুততম গতিতে কমেছে। ভারতের মতো দেশে যেখানে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ ধূমপায়ী, সেখানে এই তথ্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ল্যানসেট গবেষণার মূল নির্যাস:
গবেষকদের মতে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিউ জিল্যান্ডে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ধূমপানের হার গড়ে ৩.৫ শতাংশ হারে কমছিল। কিন্তু ২০১৮-১৯ সালে সরকার যখন ‘ভ্যাপিং’ পণ্যকে ধূমপান ছাড়ার সহায়ক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিল, তখন এই কমার হার ৫ গুণ বেড়ে ১৭.৯ শতাংশে পৌঁছাল। ২০২২-২৩ সালের মধ্যে সেখানে দৈনিক ধূমপায়ীর সংখ্যা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
নিউ জিল্যান্ডের ‘টু-প্রংড’ বা দ্বি-মুখী কৌশল:
গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিউ জিল্যান্ড প্রথাগত ধূমপান বিরোধী আইনগুলি (যেমন- উচ্চ কর, সাধারণ প্যাকেজিং, গ্রাফিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা) বাতিল করেনি। বরং সেগুলোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত ভ্যাপিং বিকল্পকে জায়গা দিয়েছে। একইসাথে তরুণ প্রজন্ম যাতে এই বিকল্পে আসক্ত না হয়, তার জন্য কঠোর নিরাপত্তা বিধিও মেনে চলা হয়েছে:
ন্যূনতম ক্রয়ের বয়স ১৮ বছর।
ফ্লেভার এবং নিকোটিনের ঘনত্বের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা।
ডিসপোজেবল ভ্যাপিং পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
খুচরা বিক্রয় ও বিপণনের ওপর কড়া বিধিনিষেধ।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ও বিতর্ক:
ভারত ২০১৯ সালের ‘প্রহিবিশন অফ ইলেকট্রনিক সিগারেট অ্যাক্ট’ অনুযায়ী ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে। তবে প্রথাগত সিগারেট এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্য আইনত সহজলভ্য। চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, বেশিরভাগ রোগ হয় তামাক পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে, নিকোটিনের কারণে নয়। পালমোনোলজিস্ট ডা. সৌরভ তোমারের মতে, “নিকোটিন এবং দহনজাত তামাকের মধ্যে পার্থক্যটি জনস্বাস্থ্য নীতি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।”
অন্যদিকে, অনেক ভারতীয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এখনও এই বিষয়ে সতর্ক। তাঁদের মতে, ভারতের প্রেক্ষাপটে যুব সমাজের মধ্যে আসক্তি বৃদ্ধি, যথেচ্ছ বিপণন এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।
ভারতের জন্য কি কোনো শিক্ষা আছে?
ডা. সতীশ কুমারের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিউ জিল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায় যে প্রথাগত নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রিত ‘হার্ম রিডাকশন’ বা ক্ষতি হ্রাস কৌশল একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। তবে ভারত ও নিউ জিল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও জনমিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তাই ভবিষ্যতে কোনো নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বিজ্ঞানের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।