আবাসের টাকা মেলেনি সময়মতো! বাঁকুড়ায় মাটির দেওয়াল চাপা পড়ে শেষ ২ বছরেরর ফুটফুটে শিশু, কাঠগড়ায় প্রশাসন!

ভাঙা মাটির ঘরেই দিন কাটছিল। আশা ছিল সরকারি আবাস যোজনার টাকায় দ্রুত পাকা ছাদ তৈরি হবে। কিন্তু প্রথম কিস্তির টাকা পেয়ে কাজ শুরু হলেও, বাকি টাকা আর মেলেনি। আর সেই লাল ফিতের ফাঁসেই এবার অকালে ঝরে গেল এক ২ বছরের ফুটফুটে শিশুর প্রাণ! মঙ্গলবার সকালে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর ব্লকের আমডহরা গ্রামে মাটির বাড়ির দেওয়াল ধসে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে তামিম খান নামের এক শিশু। প্রশাসনের উদাসীনতা এবং আবাসের টাকা আটকে থাকার কারণেই এই ট্র্যাজেডি, এমনটাই অভিযোগ তুলে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন নিহতের পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

থমকে ছিল কাজ, বিপজ্জনক ঘরেই কাটছিল দিন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আমডহরা গ্রামের বাসিন্দা নিম্বার খানের মাটির বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। বিধানসভা নির্বাচনের আগেই সরকারি আবাস যোজনার উপভোক্তাদের তালিকায় তাঁর নাম উঠেছিল। কিন্তু অভিযোগ, নিম্বার খান মাত্র প্রথম কিস্তির ৬০,০০০ টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে নতুন বাড়ির কাজ শুরু করলেও বাকি টাকা আর না পাওয়ায় নির্মাণ কাজ মাঝপথেই থমকে যায়। ফলে বাধ্য হয়েই সপরিবারে ওই বিপজ্জনক মাটির ঘরেই দিন কাটাতে হচ্ছিল তাঁদের। সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টিতে মাটির দেওয়ালটি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

হুড়মুড়িয়ে ভাঙল দেওয়াল, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই শেষ!
মঙ্গলবার সকালে যখন দুর্ঘটনাটি ঘটে, তখন ঘরের ভেতরে নিম্বার খানের পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশী মিলিয়ে মোট পাঁচজন ছিলেন। হঠাৎই কোনো সতর্কতা ছাড়া হুড়মুড়িয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে মাটির দেওয়ালটি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যান সকলে।

বিকট শব্দ শুনে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরাই দ্রুত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ঘরের ভেতরে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করেন। গুরুতর জখম অবস্থায় ২ বছরের শিশু তামিম খানকে বিষ্ণুপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন নিম্বার খানের পুত্রবধূ মাহেদা খান, নাতনি রুমা খান এবং প্রতিবেশী রিয়া চৌধুরীসহ আরও একজন। বর্তমানে বিষ্ণুপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁরা।

“টাকাটা সময়মতো পেলে আজ ও বেঁচে থাকত…”
কান্নায় ভেঙে পড়ে নিম্বার খানের পরিবার জানাচ্ছে, এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী সরকারি গাফিলতি। সঠিক সময়ে আবাসের বাকি টাকা পেলে পাকা ঘর তৈরি হয়ে যেত, আর তাঁদের এই বিপজ্জনক ঘরে থাকতে হতো না। এক প্রতিবেশী ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রশ্ন তোলেন, “মাত্র প্রথম কিস্তির টাকা দিয়ে কীভাবে একটা আস্ত বাড়ি তৈরি শেষ করা সম্ভব? বাকি টাকা না দেওয়ায় পরিবারটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো।”

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজ্য জুড়ে আবাস যোজনার টাকা বণ্টন ও বিলম্বের প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। কাকতালীয়ভাবে, এদিনই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন যে, কেন্দ্র আরও এক লক্ষ বাড়ির জন্য তহবিল অনুমোদন করেছে এবং আবাস যোজনার বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। তবে সরকারি বরাদ্দের এই টানাপড়েনের মাঝেই বাঁকুড়ার এক দরিদ্র পরিবারের কোল খালি হয়ে যাওয়ায় এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *