কেন সোনার ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করেন পুরীর রাজা? রথযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে কোন গোপন রহস্য?

রথযাত্রার দিন পুরীর বড়দণ্ডে এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হন দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ ভক্ত। জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার রথের সামনে এসে যখন পুরীর গজপতি মহারাজা নিজের হাতে রাস্তা পরিষ্কার করেন, তখন সেখানে এক পবিত্র আবহ তৈরি হয়। শতাব্দি প্রাচীন এই রাজকীয় আচারটি ‘ছেরা পহনরা’ নামে পরিচিত। কিন্তু কেন এই কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয় সোনার ঝাড়ু? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দর্শন।

কেন সোনার ঝাড়ুই ব্যবহার করা হয়?
সনাতন ঐতিহ্যে সোনা কেবল বিলাসিতার প্রতীক নয়, এটি পবিত্রতা ও শুদ্ধতার চরম নিদর্শন। জগন্নাথদেব স্বয়ং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নাথ। তাঁর রথের যাত্রা হবে শুদ্ধ এবং পবিত্র পথে—এই বিশ্বাস থেকেই সোনার ঝাঁটার ব্যবহার। রাস্তা পরিষ্কারের সময় তাতে সুগন্ধি চন্দন জলও ছিটিয়ে দেওয়া হয়, যা রথের যাত্রাপথকে করে তোলে স্বর্গীয়।

অহংকার ত্যাগের বার্তা:
সোনার ঝাঁটার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য লুকিয়ে আছে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অহংকার চূর্ণ করার দর্শনে। একজন রাজা, যিনি রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, তিনি যখন নিজের হাতে সোনার ঝাড়ু নিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করেন, তখন তিনি কার্যত নিজের রাজকীয় অহংকার ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করেন। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয় যে, পৃথিবীর সমস্ত বৈভব ও সম্পদ ঈশ্বরের দাসত্বের তুলনায় তুচ্ছ।

ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান:
পুরীর রাজাকে জগন্নাথদেবের ‘প্রথম সেবক’ বা ‘প্রধান সেবক’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আচারের মাধ্যমে এটিই প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ঈশ্বরের দরবারে রাজা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। গজপতি মহারাজা যখন তাঁর রাজকীয় পোশাক ও ঐশ্বর্য নিয়ে ভক্তদের সামনে ঝাড়ু হাতে দাঁড়ান, তখন তিনি প্রমাণ করেন যে ঈশ্বরের সেবায় ছোট-বড়র কোনো তফাত নেই।

রথযাত্রার মাহাত্ম্য:
আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় তিথিতে তিন ঠাকুরকে রথে বসিয়ে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার ঠিক আগেই সম্পন্ন হয় এই বিশেষ আচার। ভক্তদের বিশ্বাস, এই রথযাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ যেমন পাপ বিনাশ করে, তেমনই ‘ছেরা পহনরা’ বা এই পবিত্র আচার দর্শন করলে পরম পুণ্য লাভ হয়। রথযাত্রার এই অনন্য ঐতিহ্য আজও বিশ্ববাসীকে বিনয় ও সমর্পণের এক অসামান্য পাঠ দিয়ে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *