“বিছানায় যত বেশি জায়গা, স্বামীর মনে তত প্রতিপত্তি!” যেখানে রোগা হওয়া পাপ, স্থূলতাই এখানে নারীত্বের অহংকার!

বর্তমান আধুনিক দুনিয়া যখন মেদহীন শরীর, ডায়েট চার্ট আর জিম সেশনে বুঁদ হয়ে আছে, ঠিক তখনই বিশ্বের এক কোণে লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তব। সেখানে ওজন কমানো নয়, বরং ওজন বাড়ানোই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। শুনতে অবাক লাগলেও, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায় (Mauritania) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রোগা মেয়েদের ‘অলক্ষ্মী’ বা দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হতো। তাদের ধারণা, একজন নারী যত স্থূল হবেন, তিনি তত বেশি ধনী, সুন্দরী এবং বিয়ের জন্য যোগ্য।
আর এই আজব সৌন্দর্য অর্জনের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক নির্মম ও ভয়ঙ্কর প্রথার গল্প, যার নাম ‘লেবলুহ’ (Leblouh)।
⚠️ ‘লেবলুহ’ কী? নির্মমভাবে খাইয়ে মোটা করার এক উৎসব
ফরাসি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘গ্যাভেজ’ (Gavage)। সহজ কথায় এটি হলো মেয়েদের জোর করে খাওয়ানোর এক ঐতিহ্যবাহী নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। মাত্র ৫ বা ৬ বছর বয়স থেকেই কন্যাসন্তানদের এই নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যাতে বিয়ের উপযুক্ত হওয়ার আগেই তারা অতিরিক্ত স্থূল হয়ে উঠতে পারে।
মরুভূমির রুক্ষ পরিবেশের কারণে মৌরিতানিয়ার যাযাবর সংস্কৃতিতে খাবারের চরম অভাব ছিল। তাই যে পরিবারের নারীরা মোটা, সমাজ ধরে নিত সেই পরিবার অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী। সেখান থেকেই জন্ম নেয় একটি কুখ্যাত মৌরিতানীয় প্রবাদ:
“বিছানায় একজন নারী যত বেশি জায়গা দখল করবে, স্বামীর হৃদয়ে তার স্থান ততটাই বড় হবে।”
🥛 দৈনিক ১৬,০০০ ক্যালোরির অত্যাচার! মেনুতে কী থাকে?
প্রাপ্তবয়স্কদের যেখানে প্রতিদিন মাত্র ২,০০০ থেকে ২,৫০০ ক্যালোরি প্রয়োজন, সেখানে এই ছোট্ট মেয়েদের প্রতিদিন প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৬,০০০ ক্যালোরি গিলতে বাধ্য করা হয়। তাদের যা যা খাওয়ানো হয়:
বালতি বালতি উটের দুধ
বাজরা ও কুসকুস (এক ধরণের গমজাতীয় খাবার)
প্রচুর পরিমাণে মাখন এবং পশুর চর্বি
চীনাবাদামের তেল ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ভারী খাবার
🪵 খেতে না চাইলে জুটত অমানুষিক শাস্তি!
এই প্রথা কেবল ভালোবাসার খাতিরে খাওয়ানো নয়, বরং এটি সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের শামিল।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের রিপোর্টে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। কোনো শিশু খেতে অস্বীকৃতি জানালে বা বমি করে দিলে, তার দুই আঙুলের মাঝে কাঠের কাঠি ঢুকিয়ে জোরে চাপ দেওয়া হতো। জুটত বেদম মারধর। এই শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার শিশুদের মনে দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা তৈরি করে।
💡 সৌন্দর্যের নামে এই অত্যাচার কেবল ফ্যাশন নয়, এটি আসলে মৌরিতানিয়ার চরম দারিদ্র্য এবং পশুপালনের ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত সামাজিক নিরাপত্তার এক বিকৃত রূপ।
📉 এখনও কি বেঁচে আছে এই প্রথা?
উত্তর হলো—হ্যাঁ, তবে আগের চেয়ে অনেক কম।
শিক্ষা, সচেতনতা এবং আধুনিক চিকিৎসার প্রসারে মৌরিতানিয়ার শহরগুলোতে এই প্রথার চল প্রায় বন্ধের মুখে। তবে গ্রামীণ এলাকায় এখনও গোপনে চলছে এই নির্যাতন। ২০০০-২০০১ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ২৩ শতাংশ নারী স্বীকার করেছেন যে শৈশবে তাদের জোর করে এভাবে খাওয়ানো হয়েছিল।
🔄 বদলাচ্ছে দিন: নতুন প্রজন্মের বিদ্রোহ
টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গ্লোবাল ফ্যাশনের যুগে দাঁড়িয়ে মৌরিতানিয়ার তরুণ প্রজন্ম এখন রুখে দাঁড়াচ্ছে। তারা স্থূলতার বিপজ্জনক দিকগুলো বুঝতে শুরু করেছে। তরুণ সমাজ এবং মানবাধিকার কর্মীরা এখন স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার পক্ষে সওয়াল করছেন। এমনকি বহু ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনও এই ক্ষতিকর প্রথার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে।
আইন থাকলেও শুধু আইনের জোরে এই নির্মমতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণ, মেয়েদের শিক্ষা এবং বাল্যবিয়ে বন্ধ না হলে সৌন্দর্যের নামে এই ‘খাদ্য-নির্যাতন’ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।