মেদিনীপুরের আগাছায় ঢাকা ইতিহাসের পাতা! যেখানে চিরনিদ্রায় তিন কুখ্যাত ব্রিটিশ শাসক

শহর মেদিনীপুরের উপকণ্ঠে শেখপুরা এলাকা। সেখানকার একটি গির্জার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তিনটি প্রাচীন সমাধি। অযত্ন আর আগাছার আড়ালে ঢাকা পড়া এই সমাধিগুলো সাধারণের চোখে হয়তো কেবল ইট-পাথরের ধ্বংসাবশেষ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এই সমাধিস্থলগুলি আসলে তিন অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলাশাসক— পেডি, ডগলাস এবং বার্জের শেষ শয্যা।
যেখানে মিশে আছে বিপ্লবীদের সাহসের গল্প প্রায় ৯০ বছর আগের কথা। ১৯৩০-এর দশকে মেদিনীপুরে ব্রিটিশ শাসনের দাপট ছিল তুঙ্গে। জেলাশাসক পেডি-র অকথ্য অত্যাচারে যখন অতিষ্ঠ মেদিনীপুরের মানুষ, তখন বিপ্লবের পথে হাঁটেন দামাল ছেলেরা।
-
পেডি-র পতন: ১৯৩১ সালে বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষ গুলি করে হত্যা করেন তৎকালীন জেলাশাসক পেডিকে।
-
ডগলাস-এর পরিণতি: পরের বছর ১৯৩২ সালেই ডগলাসকে খতম করেন প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য ও প্রভাংশু পাল।
-
বার্জের শেষ: ১৯৩৩ সালে মেদিনীপুর কলেজ মাঠে ফুটবল খেলা চলাকালীন অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্তের গুলিতে শেষ হয় বার্জের দাপট।
বিস্মৃতির অতলে বীরত্বের ইতিহাস পরপর তিন বছরে তিন ব্রিটিশ শাসকের মৃত্যুর ঘটনা সারা ভারতজুড়ে ব্রিটিশদের মনে চরম ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। সেই নিহতদের শেষকৃত্য হয়েছিল শেখপুরার এই গির্জার সামনে। গবেষকদের মতে, এই সমাধিগুলো শুধুই অত্যাচারীদের শেষ ঠিকানা নয়, বরং এটি বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীদের অদম্য সাহসের জ্বলন্ত দলিল।
দীর্ঘ নয় দশক পর আজ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই সমাধিগুলো কার্যত জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। একসময় বিলেত থেকে নিহতদের পরিবারের মানুষ এখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসতেন, কিন্তু আজ তা বিস্মৃতির আড়ালে।
সংরক্ষণের দাবি আগামী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই রোমহর্ষক ইতিহাস, পরাধীনতার গ্লানি ও বীরত্বের নমুনা তুলে ধরতে এলাকাবাসীরা অবিলম্বে এই সমাধিস্থলগুলি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। গবেষকদের মতে, প্রশাসনের উদ্যোগে যদি এই স্মৃতিচিহ্নগুলি রক্ষা করা যায়, তবে তা হবে মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি এক প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য। ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা কেবল দায়িত্ব নয়, এটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে বড় এক শিক্ষা।