“নিম গাছের নিচে জন্ম, কেলেঙ্কারিতে পতন!”-ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ কি ফিরবে হারানো গৌরব?

কসময় নিম গাছের নিচে হাতবদল হতো শেয়ারের, আর আজ সেই প্রতিষ্ঠানটিই দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে স্তব্ধ। লায়ন্স রেঞ্জের যে কেন্দ্রটি একদা পাটকল, চা বাগান ও জাহাজ কোম্পানির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করত, সেই ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে (CSE) পুনরুজ্জীবিত করার জোরদার দাবি উঠেছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেট বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের ঘোষণা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে বিনিয়োগকারী মহলে।

এক গৌরবময় ইতিহাস

কলকাতার স্টক ট্রেডিংয়ের ইতিহাস ১৮৩০-এর দশক থেকে। ১৯০৮ সালের মে মাসে ১৫০ জন সদস্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ‘ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন’। ২ নম্বর চায়না মার্কেট স্ট্রিট থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘকাল এশিয়ার প্রাচীনতম এবং ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে নিজের দাপট বজায় রেখেছিল।

পতনের নেপথ্যে: কেতন পারেখ কেলেঙ্কারি

সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু ২০০১ সালে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ কেলেঙ্কারি যা সিএসই-র মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। শেয়ার বাজারে কারসাজির নায়ক কেতন পারেখ এবং তাঁর ‘কে-১০’ স্টকস চক্রের জালিয়াতি পুরো এক্সচেঞ্জকে মুখ থুবড়ে ফেলে।

  • কী করেছিলেন পারেখ? আইটি, মিডিয়া ও টেলিকম সেক্টরের ১০টি শেয়ার নিয়ে কৃত্রিমভাবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করেছিলেন।

  • ফলাফল: বাজেটের সময় বাজার পড়তে শুরু করলে সিএসইতে ধস নামে। ব্যাংকগুলো টাকা ফেরত চাইলে দালালদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যায় এবং ব্যাপক বিক্রির হিড়িক শুরু হয়। এই ধাক্কা কাটিয়ে আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ। ২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে লেনদেন ৯০ শতাংশ কমে যায়।

পুনরুজ্জীবিত করার চ্যালেঞ্জ:

সরকার সিএসই-কে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও, এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। সামনে রয়েছে একাধিক বড় বাধা: ১. আইনি জটিলতা: ২৫৩ কোটি টাকায় সৃজন গ্রুপের কাছে সম্পদ বিক্রির বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। ২. সেবি (SEBI)-র অনুমতি: এক্সচেঞ্জ ফের চালু করতে হলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার কঠোর নিয়মাবলী মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ৩. পরিকাঠামো: বর্তমান যুগে আধুনিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ও ক্লিয়ারিং সিস্টেম গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। ৪. বিশ্বাসযোগ্যতা: দীর্ঘ ১৩ বছর পর বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আশার আলো কি দেখা যাচ্ছে?

অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের মতে, সিএসই পুনরায় চালু হলে পূর্ব ভারতের কোম্পানিগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহ সহজতর হবে এবং রাজ্যে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে যাবে। কলকাতা আবারও পূর্ব ভারতের আর্থিক কেন্দ্রে পরিণত হবে—এমনটাই স্বপ্ন দেখছে রাজ্য সরকার।

তিলোত্তমার আর্থিক ইতিহাস কি তবে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে? নাকি আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতার চোরাবালিতেই আটকে থাকবে লায়ন্স রেঞ্জের সেই পুরনো দাপট? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের গর্ভে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *