উদ্বাস্তুদের ত্রাতা বিধান চন্দ্র রায়! দেশভাগের পর যেভাবে আগলেছিলেন লাখো হিন্দুকে

আজ ১ জুলাই, ‘ডাক্তার দিবস’। চিকিৎসাজগতে ভারতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং আধুনিক বাংলার রূপকার ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জন্ম ও প্রয়াণ দিবস। কেবল একজন চিকিৎসক হিসেবেই নয়, দেশভাগের পরবর্তী উত্তাল সময়ে লক্ষ লক্ষ বাস্তুহারা মানুষের ত্রাতা হিসেবেও তিনি বাংলার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন।
শরণার্থীদের ত্রাণকর্তা: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ও ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গার শিকার হয়ে যখন দলে দলে হিন্দু শরণার্থীরা পশ্চিমবঙ্গে আসতে শুরু করেন, তখন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের আচরণ ছিল কিছুটা উদাসীন। সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে ডঃ বিধান চন্দ্র রায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতির হাল ধরেন।
কীভাবে উদ্ধার ও পুনর্বাসন করেছিলেন ডঃ রায়?
-
অপারেশন উদ্ধার: ডঃ রায়ের নির্দেশে নিজস্ব উদ্যোগে ১৬টি চার্টার্ড বিমান ও ১৫টি বড় যাত্রীবাহী স্টিমার পাঠিয়ে ঢাকা, ফরিদপুর ও বরিশাল থেকে আতঙ্কিত হিন্দুদের সুরক্ষিতভাবে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়।
-
রিফিউজি কলোনি ও উপনগরী: বাস্তুহারা মানুষদের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দফতর গঠন করেন এবং ৩৮৯টি ত্রাণ শিবির ও কলোনি স্থাপন করেন। এমনকি কলকাতার ওপর চাপ কমাতে নদীয়ার ‘কল্যাণী’ এবং কলকাতার উপকণ্ঠে আধুনিক ‘সল্টলেক’ (বর্তমান বিধাননগর) শহর গড়ে তোলেন তিনি।
-
কর্মসংস্থান: উদ্বাস্তু যুবকদের স্বনির্ভর করতে তিনি কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম (CSTC) প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে সেখানে চাকরির সুযোগ করে দেন।
-
স্বাস্থ্যসেবা: শরণার্থী শিবিরগুলোতে মহামারী ও টিবি রোগের প্রকোপ বাড়লে যাদবপুর ও কাঁচরাপাড়ায় বিশেষ হাসপাতাল তৈরি করে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তিনি।
চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক: ডঃ রায়ের কাজের স্বীকৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি সমালোচনার জায়গাও ছিল। সে সময় উদ্বাস্তুর সংখ্যাধিক্যের কারণে অনেককে দণ্ডকারণ্য বা রাঢ় বঙ্গে পাঠানো হয়েছিল, যার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার কারণে অনেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। তৎকালীন বিরোধী দল তথা বামফ্রন্ট নেতৃত্ব এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
স্মরণীয় কর্মযোগী: আজ তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিনে কেবল চিকিৎসকরাই নন, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই কর্মযোগীকে। আধুনিক বাংলার পরিকাঠামো নির্মাণে এবং শরণার্থীদের নতুন জীবন দানে তাঁর অবদান চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।