“শের-এ-পাঞ্জাব”-এর আদর্শে বিজেপি! পাঞ্জাব জয়ের ব্লুপ্রিন্ট কি এখন কেবল সিং ধিলনের হাতে?

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই পাঞ্জাবের রাজনীতিতে বড়সড় রদবদল ঘটিয়ে চমক দিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দীর্ঘদিনের হিন্দু মুখ সরিয়ে এবার দল বাজি ধরল জাট শিখ ব্যক্তিত্ব কেবল সিং ধিলনের ওপর। পাঞ্জাব বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি হিসেবে তাঁর এই নিয়োগকে নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা; বরং একে বিজেপির সুপরিকল্পিত সম্প্রসারণ কৌশলের এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পরই কেবল সিং ধিলন পাঞ্জাবে বিজেপির এজেন্ডা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। দলের এই ‘পাঞ্জাবের সিংহ’ অর্থাৎ মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের আদর্শে সরকার গড়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। অমৃতসর সফরের সময় তিনি কেবল হরমন্দির সাহিবের মতো ধর্মীয় স্থানেই মাথা নত করেননি, বরং মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের প্যানোরামা পরিদর্শন করে এক নতুন প্রচার অভিযানের সূচনা করেছেন। রাজ্যসভার সাংসদ তরুণ চুঘের উপস্থিতিতে তিনি শপথ নিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পাঞ্জাবকে মাদক, চাঁদাবাজি এবং গুন্ডামিমুক্ত এক সমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত করা হবে। মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের শাসনের স্মৃতিচারণ করে ধিলন বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা শিখ সাম্রাজ্যের সেই স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেন।
মহারাজা রণজিৎ সিং, যিনি ‘শের-এ-পাঞ্জাব’ নামে সমধিক পরিচিত, শিখ ইতিহাসের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিক্ষিপ্ত শিখ মিসলগুলোকে একত্রিত করে তিনি যে বিশাল শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও পাঞ্জাবের গর্ব। কেবল সামরিক শক্তি নয়, তাঁর শাসনকাল ছিল সুশাসন, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন। তাঁর রাজদরবারে হিন্দু, শিখ এবং মুসলিম—সব ধর্মের মানুষের সমান মর্যাদা ছিল। আজ বিজেপি যখন পাঞ্জাবে নিজেদের শিকড় মজবুত করার চেষ্টা করছে, তখন রণজিৎ সিংয়ের এই ‘সুশাসনের মডেল’কে সামনে আনা তাদের এক চতুর রাজনৈতিক চাল।
কেন এই কৌশল? পাঞ্জাবের রাজনীতিতে বিজেপির সামাজিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। শিখ ভোটারদের মনে নিজেদের জায়গা করে নিতে এবং নিজেদের ‘শিখ-বান্ধব’ হিসেবে তুলে ধরতে বিজেপি এই ঐতিহাসিক প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছে। কেবল সিং ধিলনের মাধ্যমে বিজেপি একটি আদর্শ সরকারের বার্তা দিতে চাইছে, যা ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং বর্তমানের বিশৃঙ্খলা দূর করতে সক্ষম। মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের প্যানোরামা পরিদর্শনের মাধ্যমে বিজেপি শিখ আবেগকে সম্মান জানিয়ে পাঞ্জাবের অন্দরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চাইছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল ভোটের কৌশল নয়, বরং পাঞ্জাবের শিখ জনমানসে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান তৈরির এক বড় প্রচেষ্টা। নির্বাচনের ময়দানে এই ‘রণজিৎ সিং মডেল’ কতটা কাজ করে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় পাঞ্জাব।