থানার মালখানাই এখন মদের আড়ত! বিহারে জব্দ করা হাজার হাজার কফ সিরাপ চুরির ঘটনায় তোলপাড়

বিহারের মতো মদ্যপান ও নেশামুক্ত রাজ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। সরকারিভাবে কঠোর মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বিরোধী আইন কার্যকর থাকলেও, অভিযোগ উঠেছে যে বিহারের প্রতাপগঞ্জ থানার মালখানা থেকেই রমরমিয়ে চলছে নেশার কারবার। থানার ভেতরেই সংরক্ষিত থাকা কোডিনযুক্ত কফ সিরাপের হাজার হাজার বোতল চুরি করে পাচার করার ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য পুলিশ।

ঘটনার সূত্রপাত রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালকের কাছে আসা একটি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে। প্রতাপগঞ্জ থানার মালখানায় রাখা জব্দ করা মাদক পাচার হচ্ছে—এই অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। তদন্তকারীরা থানার রেকর্ড যাচাই করতে গিয়ে হতবাক হয়ে যান। জানা গেছে, একটি মামলায় মোট ৭,৫৬০ বোতল কোডিনযুক্ত কফ সিরাপ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ৮টি নমুনা পাঠানোর পর অবশিষ্ট ৭,৫৪২টি বোতল মালখানায় থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ১,৩৯০টি বোতল। অর্থাৎ, মোট ৬,১৬২টি বোতল বেমালুম উধাও হয়ে গেছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, ফাঁকা হয়ে যাওয়া জায়গায় অন্য ব্র্যান্ডের ও ২০২৬ সালে তৈরি প্রায় ২,৮৪২টি নতুন বোতল রেখে দেওয়া হয়েছিল, যা থেকে স্পষ্ট যে পুলিশ জালিয়াতির মাধ্যমে আসল স্টক সরিয়ে দিয়েছিল।

শুধু কফ সিরাপ নয়, থানার হেফাজতে থাকা জব্দ করা বাইকের টায়ার, ব্যাটারি এবং অন্যান্য দামি যন্ত্রাংশও চুরি গেছে বলে অভিযোগ। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় রেকর্ডের কোনো অস্তিত্বই নেই, যা পুরো ঘটনায় পুলিশের যোগসাজশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গ্রেফতার হওয়া চৌকিদার রাহুল কুমার জেরায় চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে। সে জানিয়েছে, স্থানীয় এক ব্যক্তির হাত ধরে এই চোরাকারবার শুরু হয়েছিল। এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন দমকল বাহিনীর সিপাহী রঞ্জন রাজ এবং একাধিক পুলিশ চালক। রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত সুকৌশলে থানা থেকে মাল সরিয়ে বাইরে পাচার করা হতো এবং লভ্যাংশ ভাগ করে নেওয়া হতো। অভিযুক্ত চৌকিদার আরও স্বীকার করেছে যে, আগে থেকেই সে এখানে জব্দ করা মদ ও বাইকের পার্টস বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এমনকি প্রভাবশালী মহলের চাপে একটি ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত বাইকটিও কোনো রকম আইনি ব্যবস্থা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতাপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ধর্মেন্দ্র কুমারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এছাড়া চৌকিদার সহ চার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে এনডিপিএস (NDPS) আইনের অধীনে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপার শরথ আরএস জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন। আরও কতজন পুলিশ কর্মী এই দুর্নীতিতে যুক্ত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই ঘটনা বিহারের প্রশাসনিক মহলে এক বড়সড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *