পুত্রসন্তান হয়নি, তাই শ্বাসরোধ করে খুন! গৃহবধূ খুনে স্বামী-সহ ৪ জনের যাবজ্জীবন

কেন পুত্রসন্তান হয়নি? এই তথাকথিত ‘অপরাধ’-এর শাস্তি দিতে গিয়ে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধ করে খুনের অভিযোগ উঠল শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে বুধবার বনগাঁ মহকুমা আদালতের বিচারক এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্বামী-সহ পরিবারের ৪ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন।
কী ঘটেছিল সেই রাতে? ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালের ১৪ মে। গোপালনগরের কামদেবপুরের বাসিন্দা পিংকি কর্মকারের বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে পুত্রসন্তানের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ। পিংকি কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ায় শুরু হয় চরম অত্যাচার। মেয়েটির বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখন হঠাৎ একদিন শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে পিংকির বাপের বাড়িতে খবর দেওয়া হয় যে, তিনি অসুস্থ এবং হাসপাতালে ভর্তি।
কিন্তু বাপের বাড়ির লোকেরা হাসপাতালে পৌঁছে দেখেন, পিংকি চিকিৎসাধীন নন; বরং তাঁর নিথর দেহ পড়ে রয়েছে হাসপাতালের মর্গে। এরপরই বিষয়টি সামনে আসে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, পিংকির শ্বাসনালীর হাড় ভাঙা এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে—যা স্পষ্ট করে দেয় এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না, বরং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। পুলিশ স্বামী তারক কর্মকার, শ্বশুর সমীর কর্মকার, শাশুড়ি সাবিত্রী কর্মকার এবং দেওর জয়দেব কর্মকারকে গ্রেফতার করে।
আদালতের ঐতিহাসিক রায় দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলা এই মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য যাচাই করে বনগাঁ মহকুমা আদালতের বিচারক মৃত্যুঞ্জয় কর্মকার অভিযুক্ত চারজনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।
আদালতের রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে নিহতের দাদা বাপি কর্মকার বলেন, “দীর্ঘ নয় বছর অপেক্ষা করেছি। আমার বোনকে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিল। আদালতের এই রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক, যাতে আর কোনো বোনকে এমন নৃশংস পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।”
আইনজীবী শ্যামল বিশ্বাস জানিয়েছেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন এটিকে ‘অসুস্থতা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও সাক্ষ্যপ্রমাণে তাদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে।