ঋণের পাহাড়ে ডুবছে ভারতের তরুণ প্রজন্ম! কোন মারাত্মক ফাঁদে পা দিয়ে সবচেয়ে বেশি ধার করছেন যুবকেরা?

ভারতে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং সহজ শর্তে লোনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার মাঝে প্রায়শই এই প্রশ্নটি ওঠে যে, দেশের বাজারে কারা সবচেয়ে বেশি ঋণ বা ধার নিচ্ছেন? কারাই বা ব্যাংক ও ফিনটেক সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য? সম্প্রতি প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর আর্থিক প্রতিবেদনে এর উত্তর মিলেছে। সেই রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভারতের বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা আসলে কারা এবং ঋণ গ্রহণের প্রতিযোগিতায় কোন বয়সগোষ্ঠী বা জেনারেশন দেশের বাকিদের থেকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে।

সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা হিসেবে শীর্ষে ‘মিলেনিয়ালরা’
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, মিলেনিয়ালরা (যাদের বয়স বর্তমানে প্রায় ২৯ থেকে ৪৪ বছর) ভারতে বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের মোট ঋণের বাজারের সিংহভাগ বা সর্বোচ্চ অংশ এখন এই বয়সীদের দখলেই রয়েছে। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বয়সের মানুষেরা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিশন বা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। ফলে নতুন বাড়ি কেনা, নিজস্ব যানবাহন ক্রয়, ব্যবসা শুরু করা এবং পরিবারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতেই মূলত তাঁরা সবচেয়ে বেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

পিছিয়ে নেই ‘জেন জি’, দ্রুত বাড়ছে ধারের প্রবণতা
রিপোর্টটিতে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, জেন জি বা ‘Z’ জেনারেশনের (১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী) তরুণ-তরুণীরাও ক্রমবর্ধমানভাবে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। যদিও মোট ঋণের পরিমাণের (Loan Volume) দিক থেকে তারা মিলেনিয়ালদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে আছে, তবে নতুন ঋণগ্রহীতা বা ‘ফার্স্ট টাইম বরোয়ার্স’-দের তালিকায় তাদের সংখ্যা ও অংশ ক্রমাগত রকেটের গতিতে বাড়ছে।

বিশেষ করে পার্সোনাল লোন, কনজিউমার লোন এবং আজকের যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিনটেক ট্রেন্ড ‘বাই নাও, পে লেটার’ (BNPL) বা ‘এখন কিনুন, পরে পরিশোধ করুন’ বিকল্পগুলো জেন জি-এর তরুণদের মধ্যে ক্রমশ ঝড়ের গতিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

প্রবীণদের ঋণে অনীহা, সুরক্ষিত প্রবীণ নাগরিকেরা
তালিকায় সবচেয়ে ইতিবাচক চিত্র দেখা গিয়েছে ৪৫ বছরের বেশি বয়সী এবং প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে। এই অংশে ঋণ গ্রহণের হার সবচেয়ে কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এই বয়সে পৌঁছানোর মধ্যে অনেকেই তাঁদের জীবনের প্রধান প্রধান আর্থিক লক্ষ্যগুলো (যেমন সন্তানের পড়াশোনা বা নিজস্ব বাড়ি) অর্জন করে ফেলেন। ফলে বার্ধক্যে এসে ঋণের কিস্তি বা ইএমআই (EMI)-এর ওপর তাঁদের নির্ভরতা অনেকটাই কমে যায়।

কোন ধরনের ঋণ সবচেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে?
ভারতীয়দের পছন্দের তালিকায় থাকা শীর্ষ ৫টি লোন হলো:

হোম লোন (Home Loan)

পার্সোনাল লোন (Personal Loan)

অটো লোন বা গাড়ি কেনার ঋণ (Auto Loan)

এডুকেশন লোন বা শিক্ষা ঋণ (Education Loan)

কনজিউমার ডিউরেবল লোন (Consumer Durable Loan)

ঋণ গ্রহণের হার হঠাৎ কেন এত বাড়ছে?
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বাজারে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়, হাতের মুঠোয় থাকা সহজ ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়া এবং হরেক রকমের অনলাইন ক্রেডিট প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণ প্রজন্মকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঋণ নিতে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করছে। এছাড়াও, ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক এবং নতুন যুগের ফিনটেক কোম্পানিগুলো নিত্যনতুন ও আকর্ষণীয় ঋণের অফার দিয়ে মূলত দেশের এই তরুণ প্রজন্মকেই তাদের মূল টার্গেট বানাচ্ছে।

এটি কি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ?
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার বা বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের প্রয়োজনে বা সম্পদ তৈরির জন্য ঋণ নেওয়া কোনও ভুল কাজ নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ‘শো-অফ’ বা বিলাসবহুল জীবনযাত্রার অন্ধ চক্করে পড়ে নিজের আয়ের চেয়ে বেশি ঋণ নিলে, তা ভবিষ্যতে মারাত্মক আর্থিক দেউলিয়াত্ব ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে উড়নচণ্ডী খরচ কমিয়ে তাঁদের মাসিক ইএমআই এবং ক্রেডিট স্কোরের (CIBIL Score) মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার কড়া পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।