শুনানির ঠিক আগেই আইনি ময়দানে ‘একা’ অভিষেক! কার এক চিলতে অহংকারে হাত ধুয়ে ফেললেন মুকুটহীন আইনি সম্রাট?

ঘরে-বাইরে একের পর এক রাজনৈতিক ও আইনি সংকটে জেরবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Abhishek Banerjee) অস্বস্তি এবার এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গেল। বিধানসভায় সই জালিয়াতি মামলায় যখন কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভাগ্যনির্ধারক শুনানি চলছে, ঠিক তখনই আইনি ময়দানে কার্যত ‘একা’ হয়ে পড়লেন তৃণমূলের এই হেভিওয়েট সেনাপতি। অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে অভিষেকের হয়ে মামলা লড়া থেকে সরে দাঁড়ানোর নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিলেন দলেরই বর্ষীয়ান আইনজীবী তথা প্রভাবশালী তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। শুধু অভিষেকের ব্যক্তিগত মামলাই নয়, তৃণমূল কংগ্রেস এবং রাজ্য সরকারের সমস্ত হাই-প্রোফাইল মামলা থেকেই তিনি নিজেকে পাকাপাকিভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন বলে সূত্রের খবর। হাইকোর্টের মেগা শুনানির ঠিক আগের মুহূর্তে কল্যাণের এই বজ্রাঘাতকে ঘাসফুল শিবিরের জন্য এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বুধবার সন্ধ্যার একটি ফোনেই কাটল ছন্দ! নেপথ্যে কী?
আদালত ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিধানসভার সই জালিয়াতি কাণ্ডে হাইকোর্টে অভিষেকের হয়ে মূল আইনি লড়াইটি লড়ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর পুত্র তথা আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যার পর আচমকাই অভিষেক শিবিরের তরফ থেকে একটি ফোন যায় কল্যাণের কাছে। সেই ফোনে মামলার কৌশল নিয়ে আলোচনার মাঝেই কল্যাণের পাশাপাশি সম্পূর্ণ অন্য এক নতুন আইনজীবীর নাম মামলার জন্য প্রস্তাব করা হয়।

নিজের সাড়ে চার দশকের ওকালতি জীবনে জুনিয়র আইনজীবীদের এই ধরনের হস্তক্ষেপ বা সমান্তরাল কর্তৃত্বকে একেবারেই ভালো মনে নেননি বর্ষীয়ান এই আইনি যোদ্ধা। পেশাগত সম্মানে আঘাত লাগায় এরপরই তীব্র ক্ষোভে বেঁকে বসেন তিনি। ঘনিষ্ঠ মহলে সাফ জানিয়ে দেন, অভিষেক তো বটেই, তৃণমূল বা রাজ্য সরকার সংক্রান্ত কোনও মামলাতেই তিনি আর আগামী দিনে সওয়াল করবেন না, এমনকি নেপথ্যে থেকে পরামর্শদাতা হিসেবেও থাকবেন না।

মমতার দীর্ঘদিনের ‘সংকটমোচক’ ছিলেন কল্যাণ
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে ওকালতি করছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী দলনেত্রী থাকার দিনগুলোর আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের তৃণমূল জমানায়—দলের বহু কঠিন ও জটিল সময়ে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ বা মূল সংকটমোচক হিসেবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন এই প্রবীণ সাংসদ।

সিঙ্গুর জমি আন্দোলন, নন্দীগ্রাম মামলা বা রিজওয়ানুর রহমানের রহস্যমৃত্যুর মতো মেগা হাই-প্রোফাইল মামলা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের সই কাণ্ড, সর্বত্রই দলের একচ্ছত্র আইনি ভরসা ছিলেন কল্যাণ। আজ তাঁর এই হঠাৎ প্রস্থানে স্বাভাবিকভাবেই আইনি ময়দানে বড়সড় খামতি তৈরি হলো।

অহংবোধের চোটে হিতে বিপরীত?
একদিকে যখন সই কাণ্ডে সিআইডি-র (CID) হাত থেকে বাঁচতে রক্ষাকবচের খোঁজে আইনি আদালতে মরিয়া দৌড়ঝাঁপ করছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঠিক তখনই তাঁর শিবিরের একতরফা অহংবোধের চোটে দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও পোড়খাওয়া আইনজীবীর এভাবে হাত ধুয়ে ফেলা হিতে বিপরীত হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার, কল্যাণের এই আকস্মিক ‘বিদ্রোহের’ পর নতুন কোন আইনজীবীর হাত ধরে এই চরম আইনি বৈতরণী পার হন তৃণমূলের ‘যুবরাজ’।