তৃণমূল ভাঙন কি ‘মহারাষ্ট্র মডেল’? ক্ষমতার হাতবদলের নেপথ্যে আসল সমীকরণ কী?

বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের এমন পরিণতি বাংলা রাজনীতিতে নজিরবিহীন। ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তৃণমূল কার্যত দুই টুকরো। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই ভাঙনকে মহারাষ্ট্রের ‘শিবসেনা মডেল’-এর সাথে তুলনা করলেও, বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এই দুই ঘটনার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
মহারাষ্ট্রের ‘শিবসেনা মডেল’ কী ছিল? ২০২২ সালে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বে এমভিএ (MVA) জোটের সরকার চলাকালীন বিজেপি বিরোধী আসনে বসেছিল। উদ্ধব ঠাকরের বিরুদ্ধে আদর্শগত বিচ্যুতি ও হিন্দুত্ববাদ থেকে সরে আসার অভিযোগ তুলে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিজেপি পর্দার আড়াল থেকে সেই বিদ্রোহে পূর্ণ মদত দিয়েছিল। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের সমর্থন নিশ্চিত করে শিন্ডে শিবির। শেষে উদ্ধব ঠাকরে পদত্যাগ করলে বিজেপি শিন্ডেকে মুখ্যমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন শিন্ডের গোষ্ঠীকেই আসল ‘শিবসেনা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তৃণমূলের ভাঙন কেন আলাদা? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলার বর্তমান পরিস্থিতির সাথে মহারাষ্ট্রের কোনো মিল নেই। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
-
সরকার গঠনের বাধ্যবাধকতা: মহারাষ্ট্রে বিজেপি বিরোধী দলে ছিল এবং ক্ষমতা দখলের জন্য শিবসেনাকে ভাঙানো জরুরি ছিল। কিন্তু বাংলায় বিজেপি ইতিমধ্যেই ২০৯ আসনে জিতে সরকার গঠন করে ফেলেছে। তাই তৃণমূলকে ভেঙে নতুন করে সরকার গড়ার প্রয়োজন বিজেপির নেই।
-
বিরোধী শূন্য করার কৌশল: বিশ্লেষকদের দাবি, বিজেপি চাইছে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকুক। মমতার তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নতুন তৃণমূল’কে বিরোধী আসনে বসিয়ে বিজেপি আসলে একটি ‘সহজ’ ও নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দল চাইছে।
-
রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: মহারাষ্ট্রে সরকার দখলের লড়াই ছিল সরাসরি, আর বাংলায় লড়াইটা হলো বিরোধী পরিসর নিয়ন্ত্রণের। ঋতব্রতদের এই বিদ্রোহী শিবিরকে মান্যতা দিয়ে বিজেপি পরোক্ষভাবে রাজ্যের মূল বিরোধী শক্তিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপসংহার: মহারাষ্ট্রের ঘটনা ছিল ক্ষমতা দখলের ‘অপারেশন’, আর পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে বিরোধী দল গড়ার ‘ব্যবস্থাপনা’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ভেঙে এখন যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা বাংলার রাজনীতিতে বিজেপির প্রভাব আরও সুসংহত করবে বলেই মনে করছেন অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। তবে এই ভাঙনের নেপথ্যে থাকা আসল কুশীলব ও তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য যে সময় যত গড়াবে, ততই স্পষ্ট হবে—তা বলাই বাহুল্য।