ইলন মাস্ককে বাদ দিয়ে জেফ বেজোসের শরণাপন্ন নাসা! ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদে তৈরি হচ্ছে আস্ত শহর?

চাঁদের বুকে এবার স্থায়ীভাবে মানুষের বাসস্থান বা ঘাঁটি নির্মাণের এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। তবে এই মেগা প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় চমক অন্য জায়গায়। এ বছরই শুরু হতে যাওয়া তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবহীন চন্দ্র অভিযানের প্রথমটির জন্য মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের ‘স্পেসএক্স’ (SpaceX)-কে পুরোপুরি বাদ দিয়েছে নাসা। তার বদলে বেছে নেওয়া হয়েছে অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ব্লু অরিজিন’ (Blue Origin)-কে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘জাতীয় মহাকাশ নীতি’র অংশ হিসেবে ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষের আধা-স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এই যৌথ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
ইলন মাস্ককে বাদ দিয়ে জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’!
দুই হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলার ব্যয়ে চাঁদে এই স্বপ্নিল ঘাঁটি নির্মাণের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে নাসা। ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এক হাই-প্রোফাইল সংবাদ সম্মেলনে নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এই প্রকাশ্য ঘোষণা দেন। আগামী শরতের শুরুতেই প্রথম মিশনটি পরিচালনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে বেজোসের ব্লু অরিজিনকে।
চন্দ্র ঘাঁটির প্রথম দুটি মিশনকে সহায়তা করতে নাসার পক্ষ থেকে কোম্পানিটিকে ২৩ কোটি ৪ লাখ ডলার দেওয়া হলেও, অভিযানের সিংহভাগ খরচ ব্লু অরিজিন নিজেই বহন করবে। নাসা প্রধান বলেন:
“মুন বেইস ওয়ান (Moonbase One) হতে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত লুনার ল্যান্ডার মিশন।”
কোনো সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ না করলেও আইজ্যাকম্যান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, গত ১০ এপ্রিল সফল হওয়া ‘আর্টেমিস টু’ মিশনের পর থেকেই নাসা এমন কিছু মহাকাশ সংস্থার সঙ্গে ‘কঠিন আলোচনা’ চালিয়ে যাচ্ছে, যারা দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মহাকাশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঙ্গিতটি সরাসরি ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের দিকেই।
চাঁদের বুকে ট্রাম্পের ‘পারমাণবিক চুল্লি’ ও চীনের সাথে টক্কর
এই চন্দ্র ঘাঁটি প্রকল্পটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির একটি অত্যন্ত কৌশলগত অংশ। ট্রাম্পের স্পষ্ট নির্দেশ—যেকোনো মূল্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চীনের আগেই পরবর্তী মানববাহী চন্দ্র অভিযান সফল করতে হবে।
নাসার নতুন প্রকাশিত ‘মুনবেইস’ ওয়েবসাইটের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদে একটি ‘কার্যক্ষম সক্ষমতাওয়ালা’ ঘাঁটি গড়ে তোলা হবে। আর এই মিশনকে সফল করতে চাঁদের বুকে একটি নিউক্লিয়ার স্পেস রিঅ্যাক্টর (Nuclear Space Reactor) বা পারমাণবিক মহাকাশ চুল্লি তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের।
কেমন হবে চাঁদের এই প্রথম ঘাঁটি?
১৯৭২ সালের পর এই প্রথম ‘আর্টেমিস টু’ মিশন সফলভাবে ৪ জন নভোচারীকে চাঁদের কক্ষপথ ঘুরিয়ে আনার পর এই স্থায়ী ঘাঁটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেছে। তবে নাসা প্রধান স্পষ্ট করেছেন যে, শুরুতেই তারা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার মতো সরাসরি কাঁচের তৈরি গম্বুজওয়ালা চন্দ্র ঘাঁটি নির্মাণে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন না।
কীভাবে এগোবে এই মিশন?
-
অভিযানের ল্যান্ডার: ব্লু অরিজিনের ক্রায়োজেনিক জ্বালানিচালিত বিশালাকার কার্গো ল্যান্ডার ‘এন্ডিউরেন্স’ (Endurance) চাঁদের সবচেয়ে রহস্যময় ও বিপজ্জনক দক্ষিণ মেরুর ‘শ্যাকলটন ডি জেরলাচ রিজ’ নামক অঞ্চলে অবতরণ করবে।
-
ধাপে ধাপে অগ্রগতি: ১৯৬০-এর দশকের নাসার সফল ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে প্রথমে প্রচুর ল্যান্ডার, রোভার ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। কারণ আইজ্যাকম্যানের ভাষায়, “চাঁদের এই ঘাঁটিটি যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই প্রতিকূল ও বিপজ্জনক।”
-
ভবিষ্যতের লড়াই: আগামী বছর পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ‘আর্টেমিস তিন’-এর পরীক্ষামূলক মিশন চলাকালীন নাসা স্পেসএক্স-এর ‘স্টারশিপ’ এবং ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার—দুটিই মূল্যায়ন করবে এবং ২০২৮ সালের মানুষের চাঁদে পুনর্যাত্রার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
নাসা আশা করছে, বেসরকারি খাতের এই বিপুল অংশগ্রহণের ফলে মহাকাশ অভিযানের খরচ যেমন এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে, ঠিক তেমনই তৈরি হবে এক সমৃদ্ধ মহাকাশ অর্থনীতি, যা বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।