কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের মাথায় আকাশ ভাঙল! ৮ম বেতন কমিশন কার্যকর হতেই পকেট থেকে গায়েব হবে লক্ষ লক্ষ টাকা?

অষ্টম বেতন কমিশনের (8th Pay Commission) জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেশের লক্ষ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগী। কিন্তু এই অপেক্ষার শেষটা কি শেষমেশ মধুর হবে? সাম্প্রতিক সমীকরণ বলছে, নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক ক্ষতির বহর ততটাই আকাশছোঁয়া হতে পারে।
সাধারণত সরকারি মহলে ধারণা থাকে, বেতন কমিশন দেরিতে চালু হলেও বকেয়া বা অ্যারিয়ার্স (Arrears) বাবদ সমস্ত টাকা একসঙ্গে পকেটে আসে। কিন্তু এবার হিসেব উল্টে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতের পথ অনুসরণ করে মোদী সরকার যদি এবারও কড়া পদক্ষেপ নেয়, তবে বাড়ি ভাড়া ভাতা (HRA) এবং পরিবহন ভাতা (TPTA)-সহ একাধিক বড় ভাতার বকেয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন কর্মীরা। আর এই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার নয়, এক ধাক্কায় পৌঁছাতে পারে লক্ষাধিক টাকায়!
কেন বকেয়া ভাতা নিয়ে ছড়াচ্ছে তীব্র আতঙ্ক?
পূর্ববর্তী বেতন কমিশনগুলোর ইতিহাস ঘাটলে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায়— সরকার সাধারণত ‘মূল বেতন’ (Basic Pay) এবং ‘মহার্ঘ ভাতা’ (DA)-র বকেয়া টাকা আগের তারিখ (Retrospective Effect) থেকে হিসাব করে মিটিয়ে দেয়। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় অন্য ভাতাগুলোর ক্ষেত্রে।
ভাতার অংক যেখানে আটকে যায়: বাড়ি ভাড়া ভাতা (HRA), পরিবহন ভাতা, ইউনিফর্ম ভাতা এবং সন্তানদের শিক্ষা ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোর বকেয়া অর্থ দেওয়ার কোনো অতীত রেকর্ড সরকারের নেই। এই ভাতাগুলো সবসময় ‘ভবিষ্যতের তারিখ’ অর্থাৎ সরকার যেদিন বিজ্ঞপ্তি জারি করে, সেদিন থেকে কার্যকর হয়।
এর সহজ অর্থ হলো, নতুন বেতন কমিশন গঠন হওয়া থেকে শুরু করে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের মাঝের মাসগুলোতে বর্ধিত ভাতার কোনো সুবিধাই কর্মচারীরা পাবেন না। বর্তমানে সপ্তম বেতন কমিশনের অধীনে শহর অনুযায়ী ৩০%, ২০% এবং ১০% হারে HRA দেওয়া হয়, যা অষ্টম বেতন কমিশনে আরও বাড়ার কথা। ফলে এই বিলম্বের কারণে বর্ধিত ভাতার পুরোটাই হাতছাড়া হতে চলেছে কর্মীদের।
২২ মাসের বিলম্ব: হিসাবটা বুঝুন
হিসাব অনুযায়ী, সপ্তম বেতন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বর ২০২৫-এ। নিয়ম মেনে প্রতি ১০ বছর পর নতুন কমিশন চালুর প্রথা অনুসারে, অষ্টম বেতন কমিশন ১ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
কিন্তু এখানেই মোচড়! সরকার নতুন কমিশনকে তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য ১৮ মাস সময় দিয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৭ সালের মার্চের আগে সুপারিশ জমা পড়ছে না। এরপর কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটের পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত সিলমোহর পড়তে আরও ৩-৪ মাস সময় লাগবে। সব মিলিয়ে অষ্টম বেতন কমিশন বাস্তবে রূপ পেতে পেতে ২০২৭ সালের আগস্ট মাস হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ, ২০২৬-এর জানুয়ারি থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২ মাসের এক বিশাল সময়ের ভাতার টাকা পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে চলেছে।
একমাত্র স্বস্তি যেখানে
তবে এই মেঘের মধ্যেও কিছুটা আলোর রেখা রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ‘মূল বেতন’ বা বেসিক পে এবং মহার্ঘ ভাতার বকেয়া সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। ১ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে নতুন কমিশন চালুর দিন পর্যন্ত সমস্ত বকেয়া টাকা এককালীন কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যেহেতু ডিএ (DA) সবসময় মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, তাই বর্ধিত বেসিকের সাথেই ডিএ-র বকেয়া হিসাব করা হবে।
সরকারের সামনে ‘লক্ষ কোটি’ টাকার আর্থিক দেওয়াল
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং ৬৯ লক্ষেরও বেশি পেনশনভোগী রয়েছেন। দুই বছরের এই বিপুল বকেয়া টাকা একসঙ্গে মেটানো যেকোনো সরকারের রাজকোষের জন্যই এক বিরাট পরীক্ষা।
কোটাক ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজ-এর একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট অনুযায়ী:
সপ্তম বেতন কমিশনের খরচ: সরকারি কোষাগারের ওপর বোঝা চেপেছিল প্রায় ১.০২ ট্রিলিয়ন টাকা।
অষ্টম বেতন কমিশনের আনুমানিক খরচ: ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষে এই ব্যয়ের পরিমাণ এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২.৪ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.২ ট্রিলিয়ন টাকায়।
অর্থনীতির এই বিশাল চাপ সামাল দিতে এবং রাজকোষের ভারসাম্য বজায় রাখতেই মোদী সরকার ভাতার বকেয়া টাকা কাটার মতো অত্যন্ত কঠোর ও অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর তেমনটা হলে, উৎসবের মরশুমের আগেই বড়সড় পকেট কাটার আশঙ্কায় দিন গুনছেন কেন্দ্রীয় কর্মীরা।