মমতার ছবি দেখে চটে গিয়েছিলেন অনীক, পরিচালকের ‘ভবিষ্যৎ’ ঘিরে ঠিক কি ঘটেছিলো? জেনেনিন অজানা কাহিনী

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্পষ্টবক্তা ও আপসহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। তবে তাঁর সৃজনশীল সত্তা ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর বারবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন সরকারের সঙ্গে। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF) থেকে শুরু করে ‘ভবিষ্যতের ভূত’—অনীক দত্তের সাথে তৎকালীন শাসকদলের সংঘাতের প্রতিটি পর্বই ছিল চর্চিত।

বিতর্কের সূত্রপাত:
সংঘাতের ভিত্তি স্থাপিত হয় ২০১৮ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। নন্দন চত্বর জুড়ে মুখ্যমন্ত্রীর বিশাল হোর্ডিং ও প্রচার দেখে অনীক দত্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন—একটি আন্তর্জাতিক শৈল্পিক মঞ্চে চলচ্চিত্রের দিকপালদের ছবি থাকা উচিত, নাকি কোনও রাজনৈতিক নেত্রীর? এই মন্তব্য নবান্নের অন্দরমহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

‘ভবিষ্যতের ভূত’ ও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা:
২০১৯ সালে অনীক দত্তর রাজনৈতিক স্যাটায়ার ‘ভবিষ্যতের ভূত’ মুক্তি পাওয়ার পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। মুক্তির মাত্র একদিনের মধ্যে রহস্যজনকভাবে কলকাতার অধিকাংশ হল থেকে ছবিটি নামিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় তৎকালীন সরকারের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন সায়নী ঘোষের মতো শিল্পীরা। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের সামনে প্রতিবাদ সভায় সায়নী স্পষ্ট বলেছিলেন, “গণতান্ত্রিক দেশে শিল্পের টুঁটি চিপে ধরা যায় না।”

সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ:
অনীক দত্ত ও তাঁর প্রযোজনা সংস্থা আদালতের দ্বারস্থ হয়। সুপ্রিম কোর্ট তৎকালীন রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে এবং ছবিটির প্রদর্শন পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি, প্রযোজকদের কুড়ি লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও আদেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত। আইনি লড়াইয়ে অনীক দত্ত জয়ী হলেও, তাঁর সিনেমা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এই অঘোষিত হস্তক্ষেপ টলিউডের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থেকে গিয়েছে।

শিল্পীর অকুতোভয় পরিচয়:
অনীক দত্ত কখনোই রাজনৈতিক আনুগত্যের ধার ধারেননি। তাঁর সিনেমা ছিল সমকালীন রাজনীতির ওপর তীক্ষ্ণ চাবুক। সরকারের চক্ষুশূল হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে কখনোই সরে আসেননি। মুখ্যমন্ত্রী বা শাসকদলের সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়ার অভাব থাকলেও, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার যে তাঁর কর্মকাণ্ডে অস্বস্তিতে ছিল, তা স্পষ্ট ছিল ওয়াকিবহাল মহলের কাছে।

অন্যায় ও সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে অনীক দত্তর সেই লড়াই আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক সাহসী দৃষ্টান্ত হিসেবে অমলিন।