ইমিউনোথেরাপি কী? ক্যান্সার ও নানা রোগের চিকিৎসা কীভাবে করা হয়?

গত ১০ বছরে ইমিউনোথেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০০৬-২০১৬ সালের মধ্যে যেখানে এর পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় ১,২৫৭টি, গত এক দশকে তা ৪,৫৯১-এ পৌঁছেছে। ক্যান্সার নিরাময়ে বড় সাফল্যের পর এখন গবেষকদের নজর অন্যান্য জটিল রোগের দিকে।
ইমিউনোথেরাপি কী ও কীভাবে কাজ করে? ইমিউনোথেরাপি হলো এক ধরনের জৈবিক চিকিৎসা, যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় বা শান্ত করে রোগ নিয়ন্ত্রণ করে।
-
সক্রিয়করণ: অনেক সময় ক্যান্সার কোষ দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দেয়। ‘চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর’ বা অ্যান্টিবডি ওষুধ সেই নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে পুনরায় সচল করে তোলে, যা ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করে।
-
প্রকৌশল (Engineering): ‘কার-টি-সেল’ (CAR-T Cell) থেরাপিতে রোগীর নিজের ইমিউন কোষকে ল্যাবরেটরিতে নকশা করা হয়, যাতে তারা নির্দিষ্টভাবে ক্যান্সার কোষ খুঁজে ধ্বংস করতে পারে।
-
শান্ত রাখা (Suppression): অ্যালার্জি বা অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শান্ত বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়, যাতে এটি ভুলবশত শরীরের সুস্থ কোষকে আক্রমণ না করে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় সাফল্য: বর্তমানে ৩০টিরও বেশি ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্তন, মূত্রাশয়, কিডনি ও ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর চলছে ব্যাপক গবেষণা। ক্যান্সার ভ্যাকসিন বা টিকার ক্ষেত্রে ‘এমআরএএনএ’ (mRNA) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্তমানে ১০০টিরও বেশি ট্রায়াল চলছে। অভিনেতা স্যাম নিলের মতো অনেক রোগীই এখন এই থেরাপির বদৌলতে স্টেজ-৩ ব্লাড ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা: ইমিউনোথেরাপি কেবল ক্যান্সার নয়, বরং অটোইমিউন ডিসঅর্ডার ও প্রদাহজনিত রোগের চিকিৎসাতেও দারুণ সম্ভাবনা দেখাচ্ছে:
-
অ্যালার্জি: শরীরকে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী প্রোটিনের সাথে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করার প্রক্রিয়া।
-
অটোইমিউন রোগ: ‘রেগুলেটরি টি-সেল’ বা ‘ট্রেগস’ (Tregs) ব্যবহারের মাধ্যমে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, টাইপ-১ ডায়াবেটিস এবং বাতের ব্যথার মতো রোগের চিকিৎসায় বড় সাফল্যের আশা দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
-
বিষণ্নতা: ব্রিস্টলের গবেষকরা বাতের ব্যথার ওষুধ ‘টসিলিজুম্যাব’ বিষণ্নতার চিকিৎসায় প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন।
ভবিষ্যৎ কী? ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজের অধ্যাপক আড্রিয়ান লিস্টনের মতে, বিশ্বের মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটে এমন সব কারণে, যার পেছনে কোনো না কোনোভাবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে। ডায়াবেটিস থেকে শুরু করে ডিমেনশিয়া—সবকিছুর মূলেই ইমিউন সিস্টেম সক্রিয়। যেহেতু শরীরের এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করা সম্ভব, তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ এখন এই ইমিউনোলজির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
গবেষকদের মতে, ক্যান্সার সম্পর্কে ধারণাই বদলে গেছে। আমরা এখন ক্যান্সারকে কেবল একটি রোগ নয়, বরং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে দেখছি। এই ব্যর্থতাকে জয় করাই এখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য।