“পেশাগত দায়বদ্ধতা নাকি আদর্শ বিচ্যুতি?” অদিতির হয়ে মামলা লড়ে সমালোচনার মুখে বিকাশ ভট্টাচার্য

দুর্নীতির বিরুদ্ধে বামেদের প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত প্রবীণ আইনজীবী তথা সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। সম্প্রতি তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়িকা অদিতি মুন্সি ও তাঁর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীর হয়ে আদালতে সওয়াল করায় দলের অন্দরেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
পুরো ঘটনাটি কী?
বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি অদিতির মুন্সির বিরুদ্ধে হলফনামায় সম্পত্তির তথ্য গোপন ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। সেই মামলাতেই অদিতিদের আইনি লড়াই লড়ছেন বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগে সরব বিকাশবাবু, তারাই যখন অভিযুক্ত, তখন কীভাবে তাদের হয়ে আদালতে দাঁড়াচ্ছেন তিনি?
বিকাশবাবুর সাফাই:
নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, “আইনজীবী হিসেবে আমার পেশাগত দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমার কাছে বিচারপ্রার্থী এলে আমি প্রথমেই তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাই না। দর্শনগতভাবে যদি কোনো বড় বিরোধ না থাকে, তবে আমি মামলা লড়ি। আগেও মুকুল রায় বা সব্যসাচী দত্তের মতো নেতার হয়ে মামলা লড়েছি।” বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “বিজেপির রাজনৈতিক মস্তিষ্কের ঘাটতি রয়েছে। হার্ট অ্যাটাক হলে কি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করবেন তিনি কোন দল করেন?”
পাল্টা আক্রমণ ও বিতর্ক:
বিকাশবাবুর এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন দলের তরুণ প্রজন্মের নেতা থেকে শুরু করে বিরোধী শিবিরের অনেকেই।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্রমণ: তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে সরব হয়েছেন। তিনি লেখেন, “যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেকে যোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন, তিনি কীভাবে দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের পক্ষে সওয়াল করছেন? এটি চরম বৈপরীত্য।” এই ঘটনায় বিজেপি ও সিপিএমের মধ্যে কোনো ‘গোপন সমঝোতা’ আছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
দলের অন্দরে ক্ষোভ: সিপিএম সমর্থক সৌরভ পালোধি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, “যাদের দুর্নীতির জন্য হাজার হাজার বাম কর্মী আক্রান্ত বা খুন হয়েছেন, তাদের বাঁচাতে আদালতে লড়া কি কমরেডশিপের সাথে যায়?” শতরূপ ঘোষের মতো নেতারাও নাম না করে কৌশলী পোস্টের মাধ্যমে এই ঘটনার অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
পেশাগত ধর্ম বনাম রাজনৈতিক আদর্শ:
একজন প্রবীণ নেতার এই পদক্ষেপ নিয়ে এখন দুই মেরুতে মতবিভাজন। একাংশের মতে, আইনজীবী হিসেবে বিকাশবাবু পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র। অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠেও অনেক সময় ব্যক্তিগত ও দলীয় আদর্শ বড় হয়ে ওঠে, যা এখানে উপেক্ষিত হয়েছে বলে তাঁদের অভিমত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি আইনি মামলা নয়, বরং সিপিএমের অন্দরে থাকা নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের চিন্তাধারার ফারাককেও প্রকট করে দিল।