১ টাকার ‘জিলিপি’র ১০০০ বছরের ইতিহাস! ভারত ও পাকিস্তানের প্রিয় এই মিষ্টির আসল জন্মদাতা কোন দেশ?

রবিবারের সকালের জলখাবারে গরম গরম কচুরির সঙ্গী হোক বা উৎসব-পার্বণের শেষ পাত— জিলিপি (Jalebi) ছাড়া ভারতীয়দের চলে না। স্বাধীনতা দিবস বা সাধারণতন্ত্র দিবসে স্কুল-কলেজে জিলিপি বিলি করার রেওয়াজ আমাদের অতি চেনা। অনেকেই হয়তো জানেন যে, জিলিপি হলো ভারতের জাতীয় মিষ্টি (National Sweet)। কিন্তু আপনি কি জানেন, কোটি কোটি ভারতীয়ের মনের মণিকোঠায় থাকা এই মুচমুচে, রসালো মিষ্টিটি কিন্তু একেবারেই ভারতীয় নয়? এর আসল ইতিহাস শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন!

জিলিপির আদি বাড়ি কোথায়?

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জিলিপির জন্ম ভারতে নয়, বরং সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East) বা প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান)। প্রায় ১০০০ বছর আগে, অর্থাৎ দশম শতাব্দীতে আরবের বিখ্যাত রান্নার বই ‘কিতাব অল-তবিখ’-এ এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়।

  • আসল নাম ছিল ‘জুলবিয়া’: পারস্যে বা ইরানে এই মিষ্টির নাম ছিল ‘জুলবিয়া’ (Zolbiya) বা ‘জালাবিয়া’। সেখানে এটি মূলত রমজান মাসের ইফতারের সময় বা পারস্য নববর্ষের (নওরোজ) উৎসবে খাওয়া হতো। মধ্যপ্রাচ্যের সেই ‘জুলবিয়া’ কালক্রমে ভারতে এসে হয়ে গিয়েছে আমাদের সবার প্রিয় ‘জিলিপি’।

কীভাবে ভারতে এলো এই মিষ্টি?

ইতিহাসবিদদের মতে, ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে তুর্কি এবং পারস্যের ব্যবসায়ী, কারিগর ও আক্রমণকারীদের হাত ধরে এই মিষ্টি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে।

  • ১৫ শতকের দলিল: পঞ্চদশ শতাব্দীর একটি জৈন ধর্মগ্রন্থ ‘প্রিয়ঙ্কর্ণৃপকথা’-তে প্রথম ভারতে জিলিপির (তখন নাম ছিল ‘কুণ্ডলিকা’) ব্যবহারের কথা জানা যায়, যা ধনী ব্যবসায়ীদের ভোজসভায় পরিবেশন করা হতো।

  • সংস্কৃত নাম: ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের সংস্কৃত গ্রন্থ ‘গুণ্যগুণবোধিনী’-তে জিলিপি তৈরির হুবহু রেসিপি পাওয়া যায়, যেখানে একে ‘জলবল্লিকা’ (রসে ভরা মিষ্টি) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি ‘জুলবিয়া’ যেভাবে হলো খাঁটি ভারতীয় ‘জিলিপি’

মধ্যপ্রাচ্যের মূল ‘জুলবিয়া’ তৈরিতে সাধারণত মধু এবং গোলাপ জলের সিরাপ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ভারতে আসার পর এ দেশের হালুইকররা এতে নিজেদের ছোঁয়া যোগ করেন। মধুর বদলে চিনির রস এবং ব্যাটারে সামান্য ফারমেন্টেশন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার ব্যবহার জিলিপিকে আরও মুচমুচে ও রসালো করে তোলে।

জিলিপির বিশ্বভ্রমণ: শুধু ভারত নয়, বাংলাদেশ (জিলাপি), পাকিস্তান, নেপাল (জেরি) এবং আফগানিস্তানেও এই মিষ্টি ভীষণ জনপ্রিয়। তবে ভারত একে এতটাই আপন করে নিয়েছে যে, সরকারিভাবে কোনো লিখিত ঘোষণা না থাকলেও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক থেকে জিলিপিকেই ভারতের ‘জাতীয় মিষ্টি’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ছানা’র জিলিপি থেকে শুরু করে ক্ষীরের জিলিপি কিংবা বিশাল আকারের ‘জিলিপা’— ভারত এই মিষ্টির রূপই বদলে দিয়েছে। তাই পরের বার যখন গরম জিলিপিতে কামড় দেবেন, মনে রাখবেন এর প্রতিটা প্যাঁচে লুকিয়ে আছে ১০০০ বছরের এক আন্তর্জাতিক ইতিহাস!