বুলডোজার অ্যাকশন ও রাস্তায় নমাজ বন্ধের প্রতিবাদে চরম উত্তেজনা, নামল CRPF

রবিবার দুপুরের পর থেকেই কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল কলকাতার পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট ক্রসিং এলাকা। রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বুলডোজার অভিযান এবং রাস্তার ওপর নমাজ পাঠ বা ধর্মীয় জমায়েতে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে এলাকা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে নামানো হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী, র্যাফ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী (CRPF)।
স্থানীয় সূত্রে খবর, রবিবার দুপুর থেকেই পার্ক সার্কাস মোড়ে বিক্ষোভকারীরা জমায়েত হতে শুরু করেন। অভিযোগ, সরকারি নির্দেশিকা মেনে সম্প্রতি হওয়া অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদে বুলডোজ়ার অভিযান এবং রাস্তার ওপর ধর্মীয় জমায়েত বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই মূলত এই প্রতিবাদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেভেন পয়েন্ট ক্রসিং এলাকায় শুরু হয় পথঅবরোধ। ব্যস্ত সময়ে কলকাতার অন্যতম প্রধান এই সংযোগস্থলে অবরোধ তৈরি হওয়ায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় আচমকাই পুলিশের দিকে ইট ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। এরপরই রণক্ষেত্রের রূপ নেয় পার্ক সার্কাস মোড়। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পাল্টা লাঠিচার্জ শুরু করে পুলিশ। ইটের আঘাতে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন। লাঠিচার্জের জেরে কয়েকজন বিক্ষোভকারীও আহত হয়েছেন বলে খবর। উত্তেজনা প্রশমিত করতে দ্রুত এলাকায় নামানো হয় র্যাফ এবং সিআরপিএফ জওয়ানদের। গোটা এলাকা বর্তমানে কড়া সুরক্ষাবলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনের তরফে বেআইনি দখলদারি উচ্ছেদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একাধিক বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ঘোষণা করেন, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথ আটকে বা রাস্তা অবরোধ করে কোনও ধরনের ধর্মীয় জমায়েত কিংবা নমাজ পাঠ করা যাবে না। এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে এবং অসময়ে ধর্মীয় কারণে মাইক বা লাউডস্পিকার বাজানোর ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। সরকারের এই কড়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই কলকাতার কিছু এলাকায় ক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে।
পার্ক সার্কাসের বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, এই ধরণের সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নবান্নের স্পষ্ট বার্তা, কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আমজনতার নিত্যদিনের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতেই এই কড়া পদক্ষেপ। পুলিশের পক্ষ থেকেও সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আন্দোলনের নামে কোনওভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বরদাস্ত করা হবে না।
রবিবারের এই ঘটনার জেরে বেশ কিছু সময় পার্ক সার্কাস সংলগ্ন এলাকায় থমথমে পরিবেশ তৈরি হলেও, পুলিশের তৎপরতায় যান চলাচল পুরোপুরি স্তব্ধ হয়নি। লালবাজারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি আপাতত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে নতুন করে যাতে কোনও অশান্তি না ছড়ায়, তার জন্য গোটা এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে এবং সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, মাত্র কয়েক দিন আগেই কলকাতার রাজাবাজার এলাকাতেও ঠিক একই ধরনের সরকারি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে পুলিশ এবং স্থানীয়দের মধ্যে বচসা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। রাজাবাজারের সেই ঘটনার পর থেকেই কলকাতার একাধিক সংবেদনশীল এলাকায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছিল। তার মধ্যেই রবিবারে পার্ক সার্কাসের এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াল।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, উচ্ছেদ ও ধর্মীয় জমায়েত নিয়ন্ত্রণে সরকারের এই অনমনীয় অবস্থান আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তবে প্রশাসনের অন্দরের খবর, রাজনৈতিক বিতর্ক যাই হোক না কেন, শহরের বুক থেকে বেআইনি দখলদারি ও রাস্তা আটকে জনজীবন বিপর্যস্ত করার বিরুদ্ধে আগামী দিনেও একইভাবে কড়া অ্যাকশন জারি থাকবে।