বোনেরা লিখে দিল নিজেদের ভাগ, তাও ঠাঁই হলো না ভিটেয়! পূর্ণিয়ার অন্ধ যুবকের সহায় সম্বল কেড়ে নিল খোদ ভগ্নিপতি?

পূর্ণিয়ার বড়িহাটের এক চিলতে সরু গলি। এই গলিরই এক অন্ধকার ঘরে বসে এখন প্রতিদিন এমন এক লড়াই লড়ছেন রিতনেশ রাজ, যে অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার কথা তাঁর অন্তত ছিল না। চোখে দেখতে পান না রিতনেশ, ফলে তাঁর জগৎটা জন্ম থেকেই আলোহীন। কিন্তু এখন তাঁর নিজের কাছের মানুষ এবং সরকারি ব্যবস্থা—সবাই মিলে যেন একজোট হয়ে তাঁর জীবনের শেষ বেঁচে থাকার আলোটুকুও কেড়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এক প্রতিবন্ধী ভাইয়ের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাঁর বাবার একমাত্র সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়ার এক অত্যন্ত অমানবিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে বিহারের পূর্ণিয়া থেকে।

বাবার মৃত্যুর পরই শুরু হলো আসল খেলা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিতনেশের বাবা পৌরসভার দেওয়া একটি ছোট পাইকারি দোকানে সবজি বিক্রি করে কোনোমতে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। এই একটি মাত্র দোকানের উপার্জনেই সংসার চলত, রিতনেশের বোনেদের বিয়ে হয়েছে এবং দৃষ্টিহীন রিতনেশের ভবিষ্যৎও এর ওপরই টিকে ছিল। বাবা বেঁচে থাকতে তিনিই ছিলেন অন্ধ ছেলের চোখের জ্যোতি, প্রতিটি পদক্ষেপের একমাত্র অবলম্বন।

কিন্তু গত কিছুকাল আগে বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পরই রিতনেশের জীবনটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। যে সময় পরিবার ও আত্মীয়দের তাঁর পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, ঠিক তখনই তাঁর অন্ধত্বের সুযোগ নিতে শুরু করে চারপাশের মানুষ। রিতনেশের অভিযোগ, পৌরসভার কর্মচারী দীপক মণ্ডল এবং তাঁর শ্যালক মিলে সম্পূর্ণ ভুয়ো ও জাল কাগজপত্র তৈরি করে তাঁদের বাবার ওই পাইকারি ব্যবসার দোকানটি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, এখন সেই দোকানটি চড়া দামে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়ারও চক্রান্ত চলছে।

বোনদের ত্যাগ, ভগ্নিপতির লোভ এবং ‘স্বাক্ষর’ বনাম ‘টিপছাপ’-এর রহস্য
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়টি হলো রিতনেশের বোনেদের সততা এবং এক ভগ্নিপতির চরম লোভের গল্প। রিতনেশের ছয় বোন একটি স্ট্যাম্প পেপারে লিখিতভাবে সই করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁদের দৃষ্টিহীন ভাইয়ের জীবিকা যাতে সুরক্ষিত থাকে, সেজন্য বাবার দোকানে তাঁরা কেউ কোনো অংশ বা ভাগ নেবেন না। বোনেরা ভাইয়ের পাশে দাঁড়ালেও, অভিযোগ উঠেছে যে, রিতনেশের এক ভগ্নিপতি টাকার লোভে পড়ে বহিরাগতদের সাথে হাত মিলিয়ে নিজের অন্ধ শ্যালককে রাস্তায় বসানোর এই নীল নকশা তৈরি করেছেন।

এখানেই শেষ নয়, রিতনেশ আরও একটি মারাত্মক জালিয়াতির পর্দাফাঁস করেছেন। যে কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে রিতনেশকে দোকান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, সেখানে নাকি তাঁর বাবার বুড়ো আঙুলের ছাপ (টিপছাপ) রয়েছে। রিতনেশ বুক ফেটে কেঁদে উঠে জানান, “আমার বাবা যথেষ্ট শিক্ষিত মানুষ ছিলেন। তিনি আজীবন সমস্ত জায়গায় সই করতেন। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সব আইনি নথিপত্রে তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে। তাহলে এই জালিয়াতির কাগজে বাবার আঙুলের ছাপ কোথা থেকে এল?” এই একটি প্রশ্নই প্রমাণ করে দেয় যে এর পেছনে কত বড় কারচুপি করা হয়েছে।

পৌরসভার রূঢ় আচরণ ও এক অন্ধ ভাইয়ের অসহায় প্রশ্ন
আজ এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং নিজের বেঁচে থাকার অধিকারটুকু ফিরে পাওয়ার আশায় রিতনেশ যখন লাঠি ঠুকে পৌরসভা কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেও তাঁর কপালে জুটেছে চরম অপমান। অভিযোগ উঠেছে, পৌরসভার এক আধিকারিক বা কর্মচারী এই দৃষ্টিহীন রিতনেশ এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পা-প্রতিবন্ধী বোনকে সাহায্য করা তো দূরস্ত, উল্টো অত্যন্ত কটু ভাষায় বকাঝকা করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দেন।

একদিকে অন্ধ ভাই, অন্যদিকে পা-প্রতিবন্ধী বোন—আর তাঁদের সামনে আজ সমাজের সব কটা দরজাই বন্ধ। এই দৃশ্য যে কোনো পাথরের মনকেও গলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ রিতনেশের সামনে কোনো চাকরি নেই, পরিবারের কোনো উপার্জনকারী নেই, কোনো মাথা গোঁজার অবলম্বন নেই। তাঁর যা ছিল, তা হলো বাবার রেখে যাওয়া ওই ছোট্ট দোকানটি।

এখন দেখার বিষয়, এই অসহায় প্রতিবন্ধী ভাই-বোনের কান্না পূর্ণিয়া জেলা প্রশাসনের কানে পৌঁছায় কিনা, নাকি আমলাতন্ত্র আর লোভের অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে যাবে রিতনেশের বেঁচে থাকার শেষ অধিকার।