কীভাবে ফাঁস হয়েছিল NEET-এর প্রশ্নপত্র?-পুনে থেকে গ্রেফতার ‘কিংপিন’

২০২৬ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডের তদন্তে এবার সবথেকে বড় সাফল্য পেল সিবিআই (CBI)। যাকে বলে, একেবারে সর্ষের মধ্যেই ভূতের সন্ধান মিলল। দেশজুড়ে কোটি কোটি টাকার এই প্রশ্ন লিক কেলেঙ্কারির মূলচক্রী বা ‘কিংপিন’ হিসেবে পুনের এক নামী রসায়নের শিক্ষককে গ্রেফতার করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। অভিযোগ, পরীক্ষার আগেই নিজের বাড়িতে একটি গোপন টিউশন সেশন বসিয়ে একাধিক পরীক্ষার্থীর কাছে হুবহু প্রশ্ন ও উত্তর ফাঁস করে দিয়েছিলেন এই শিক্ষক।

কে এই ‘কিংপিন’ কুলকার্নি?

সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত অভিযুক্তের নাম পিভি কুলকার্নি। তিনি কোনো সাধারণ শিক্ষক নন, বরং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ (NTA)-এর পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এমনকি গত ৩ মে অনুষ্ঠিত হওয়া নিট-ইউজি পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। সিবিআই-এর দাবি, এই রসায়নের অধ্যাপক শুধু এবারই নন, গত কয়েক বছর ধরে নিট-এর প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারী প্যানেলেরও অন্যতম সদস্য ছিলেন। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই প্রশ্নপত্র হাত করেছিলেন তিনি।

সংবাদসংস্থা পিটিআই (PTI) সূত্রে খবর, এই অবসরপ্রাপ্ত কলেজ অধ্যাপককে গত ১৪ মে, বৃহস্পতিবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে সিবিআই। ম্যারাথন জেরার পর তাঁর বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি মেলায় এবং চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে আসতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

পুনের গোপন ডেরায় কোটি টাকার খেলা!

তদন্তকারীদের দাবি, অপর এক অভিযুক্ত মণীষা ওয়াঘমারের সহায়তায় কুলকার্নি এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পুনেতে নিজের বাড়িতে একটি অতি গোপনীয় কোচিং সেশন শুরু করেছিলেন। সেখানে বাছাই করা কিছু পরীক্ষার্থীকে ডেকে এনে পরীক্ষার আসল প্রশ্ন এবং তার সঠিক উত্তরগুলি মুখস্থ করানো হয়। এই চক্রে জড়িত থাকার অপরাধে বৃহস্পতিবার মণীষাকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সিবিআই তাদের অফিসিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে, “ওই স্পেশাল কোচিং ক্লাস চলাকালীন রসায়নের অধ্যাপক নিজে প্রশ্ন, অপশন এবং সঠিক উত্তরগুলি বলে দিতেন। ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসে সেগুলি নিজেদের খাতায় লিখে নিত। পরবর্তীতে দেখা যায়, ৩ মে-র আসল নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ওই খাতায় লেখা প্রশ্নগুলি হুবহু মিলে গিয়েছে।” গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, এই গোপন সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য একেকজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল কয়েক লক্ষ টাকা। এই গ্রেফতারির পর রসায়নের প্রশ্ন ফাঁসের আসল উৎসটি শেষ পর্যন্ত সামনে এল।

এখনও পর্যন্ত সিবিআইয়ের জালে কতজন?

নিট মামলা হাতে নেওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে একের পর এক অ্যাকশন শুরু করেছে সিবিআই। গত ১৪ মে পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মোট সাতজনকে গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। পুনের এই শিক্ষক ও তাঁর সহযোগী ছাড়াও রাজস্থানের জয়পুর থেকে মাঙ্গি লাল এবং দিনেশ বিওয়াল নামে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের দাবি, রাজস্থানের সিকার জেলা থেকে এই প্রশ্ন ফাঁস চক্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, যার অন্যতম প্রধান যোগসূত্র ছিল এই মাঙ্গি লাল ও দিনেশ। পুলিশ জানিয়েছে, এই পরিবারটি এর আগেও মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও বিক্রির কালো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এরা শুধু এবারই সিকারের বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে প্রশ্ন বিক্রি করেনি, অতীতেও নিজেদের পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রশ্ন জোগাড় করে পরে তা চড়া দামে অন্যদের কাছে বিক্রি করেছিল বলে অভিযোগ।

উল্লেখ্য, গত ৩ মে দেশজুড়ে প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী নিট-ইউজি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা শেষের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশ্ন ফাঁসের অকাট্য প্রমাণ মেলায় গোটা পরীক্ষাটি বাতিল করতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। দেশজোড়া বিতর্কের মাঝে তদন্তভার যায় সিবিআই-এর হাতে। এবার খোদ প্রশ্ন প্রস্তুতকারী প্যানেলের সদস্য গ্রেফতার হওয়ায় এই চক্রের শিকড় কতদূর ছড়ানো, সেটাই এখন খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।