“কান টানা হয়ে গেছে, এবার মাথা মমতার পালা!” ৩ আইপিএস সাসপেন্ড হতেই বিস্ফোরক তিলোত্তমার মা

তিলোত্তমা কাণ্ডের সুবিচারের দাবিতে প্রথম থেকেই যে আন্দোলনের সুর বেঁধেছিলেন নির্যাতিতার মা, তা এবার এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পেল। রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরেই আরজি কর মামলার ফাইল যে নতুন করে খোলা হবে, সেই প্রতিশ্রুতি আগেই দিয়েছিল বিজেপি। আর নতুন ক্যাবিনেট গঠনের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে ঘটে গেল এক মস্ত বড় তোলপাড়। কর্তব্যে গাফিলতি ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে একযোগে সাসপেন্ড করা হলো বিনীত গোয়েলসহ ৩ জন হেভিওয়েট আইপিএস (IPS) অফিসারকে।

প্রশাসনের এই নজিরবিহীন অ্যাকশনের পরেই এবার সরাসরি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তুললেন নির্যাতিতার মা—যিনি বর্তমানে বিজেপির টিকিটে জিতে পানিহাটির নতুন বিধায়ক। ৩ পুলিশ কর্তার সাসপেনশনের পর এক বিস্ফোরক বয়ানে তিনি বলেন, “কান যখন এসে গিয়েছে, মাথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো অবশ্যই ধরা পড়বে।”

“ওনার নির্দেশ ছাড়া কিচ্ছু হয়নি!”—মমতার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

তিলোত্তমার মায়ের অভিযোগের তির সরাসরি প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দিকে। তিনি দাবি করেন, ঘটনার পর গোটা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে শীর্ষ স্তরের হাত ছিল। তাঁর কথায়, “কান যখন এসে গিয়েছে, মাথা তো ধরা পড়বেই। মাথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্যই ধরা পড়বে। উনি তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। ওনার নির্দেশ ছাড়া ওখানে কিচ্ছু হয়নি।”

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাড়ির একটি কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে পানিহাটির বিধায়ক বলেন, “ঘটনার চার দিন পর উনি যখন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, তখন আমাকে বলেছিলেন—‘আমি আসল অপরাধীকে ধরেই ফেলেছি।’ আমি তখন ওনাকে স্পষ্ট বলেছিলাম, ‘না ম্যাডাম, যাকে আপনারা ধরেছেন, তাকে আমরা আসল অপরাধী মনে করি না।’”

সেমিনার রুমের রহস্য ও ডিনার পার্টনারদের গ্রেফতারির দাবি

তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বলতে গিয়ে নির্যাতিতার মা আরজি করের বিতর্কিত চিকিৎসক এবং সেই রাতের ঘটনার সাথে যুক্ত সন্দেহভাজনদের দিকেও তোপ দাগেন। তিনি বলেন, “সেমিনার রুমে, অর্থাৎ ক্রাইম সিনে যারা উপস্থিত ছিল, সেখানে তো ওদের থাকার কথাই ছিল না। অভিক, বিরুপাক্ষ, দেবাশিস সোম, প্রসূন চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকেই সেদিন সেখানে কী করছিলেন?”

একই সাথে তিনি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে জানান, ঘটনার দিন রাতে তাঁর মেয়ের সঙ্গে হাসপাতালের যে চিকিৎসকেরা ডিনার করেছিলেন, তাঁরাও এখন তদন্তের আওতায়। তিলোত্তমার মায়ের সাফ কথা, “আমার মেয়ের সঙ্গে যাঁরা সেদিন ডিনার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে আমি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই। কেবল জিজ্ঞাসাবাদ নয়, তাদের গ্রেফতার করে তদন্ত করতে হবে।”

৩ হেভিওয়েট আইপিএস সাসপেন্ড, লড়াই জারি রাখার ঘোষণা

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরেই শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছিলেন যে আরজি কর মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু করা হবে এবং অপরাধীদের রেয়াত করা হবে না। সেই প্রতিশ্রুতি মতোই তিলোত্তমার মায়ের বুধবারের আদালত অভিযানের পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। বুধবার নির্যাতিতার মা পানিহাটির তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দাস এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতারির দাবিতে আদালতে দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বর্তমান রাজ্য সরকার ৩ জন শীর্ষ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার বড় সিদ্ধান্ত নেয়। ধৃত বা সাসপেন্ড হওয়া এই আধিকারিকদের তালিকায় রয়েছেন—

  • বিনীত গোয়েল: (তৎকালীন পুলিশ কমিশনার, বর্তমানে রাজ্যের ডিজি-আইবি)

  • অভিষেক গুপ্ত: (তৎকালীন ডিসিপি নর্থ, বর্তমানে ইএফআরের কমান্ডান্ট, পদমর্যাদায় ডিআইজি)

  • ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়: (তৎকালীন তদন্তকারী অফিসার, বর্তমানে সিআইডির স্পেশ্যাল সুপারিনটেনডেন্ট)

মেয়ের খুনের বিচার এবং গোটা চক্রটিকে উপড়ে ফেলতে তিনি শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত ময়দানে থাকবেন জানিয়ে পানিহাটির নতুন বিধায়ক দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমি লড়াই চালিয়ে যাব!” ৩ আইপিএস-এর এই সাসপেনশনের পর আরজি কর তদন্তের জল আগামী দিনে কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার।