রেকর্ড গড়লেন নীতীশ কুমার! ১০ম বারের জন্য বিহারের CM! দেশের ইতিহাসে তিনি কেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন?

নীতীশ কুমার দশম বারের মতো বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নয়া রেকর্ড গড়েছেন। তিনি হলেন দেশের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি ১০ বার মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিলেন। যদিও মেয়াদের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকার রেকর্ড এখনও সিকিমের পবন কুমার চামলিংয়ের দখলে।

নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক যাত্রা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লালু যাদবের রাজনীতি থেকে বিহারকে মুক্ত করতে এবং রাজ্যের উন্নয়নের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নীতীশ কুমারের একটি বড় অর্জন হলো তিনি বিহারের মহিলাদের প্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন, যার প্রভাব ২০২৫ সালের নির্বাচনেও দেখা যায়। এই কারণেই নীতীশ কুমারকে বিহারের রাজনীতিতে একজন নেতা হিসেবে নয়, বরং একটি যুগ হিসেবে স্মরণ করা হবে।

নীতিশ কুমারের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

 

  1. জন্ম ও পরিবার: নীতীশ কুমারের জন্ম ১৯৫১ সালের ১ মার্চ পাটনার বখতিয়ারপুরে। তাঁর বাবা কবিরাজ রাম লক্ষ্মণ ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। মায়ের নাম পরমেশ্বরী দেবী। নীতীশ কুমারের ডাকনাম ছিল “মুন্না”

  2. শিক্ষাজীবন: তিনি বখতিয়ারপুরে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং জুনিয়র গ্রেড থেকে হাই স্কুল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সকল বিষয়ে শীর্ষস্থান অর্জন করেন।

  3. ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি: ১৯৭২ সালে, তিনি বিহার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে এনআইটি পাটনা) যান্ত্রিক প্রকৌশল (Mechanical Engineering) পড়ার জন্য ভর্তি হন এবং সফলভাবে তার পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।

  4. সরকারি চাকরি ত্যাগ: পড়াশোনা শেষে তিনি বিএসইবি (বিহার রাজ্য বিদ্যুৎ বোর্ড)-তে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরিও নেন। তবে, সেই চাকরিতে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন।

  5. রাজনৈতিক অভিষেক: ১৯৭৪ সালে, তিনি বিহারের জেপি আন্দোলনে যোগ দেন এবং এই আন্দোলনের সময় তাকে জেলও খাটতে হয়। এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করে।

  6. প্রথম জয়: জয়প্রকাশ নারায়ণ, রাম মনোহর লোহিয়া এবং ভি.পি. সিংয়ের মতো নেতাদের নির্দেশনায় তিনি ১৯৮৫ সালে হারনাউত থেকে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

  7. কেন্দ্রীয় মন্ত্রীত্ব: ১৯৮৯ সালে তিনি বারহ থেকে প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য হন এবং দুবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯০ সালে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রীয় রেল ও ভূ-পরিবহন মন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন।

  8. ৭ দিনের মুখ্যমন্ত্রী: নীতীশ কুমার প্রথমবার ২০০০ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন, কিন্তু মাত্র সাত দিনের মধ্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

  9. পুনরাগমন: তিনি হাল না ছেড়ে ২০০৫ সালে লালু প্রসাদ যাদবের ১৫ বছরের সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন এবং এনডিএ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন।

  10. দলবদল ও জোট পরিবর্তন: ২০১৩ সালে এনডিএ ত্যাগ, ২০১৪ সালে দলের খারাপ ফলাফলের জন্য পদত্যাগ, ২০১৫ সালে মহাজোটে যোগদান, ২০১৭ সালে মহাজোট ত্যাগ করে বিজেপিতে প্রত্যাবর্তন এবং ২০২২ সালে পুনরায় আরজেডি-কংগ্রেস জোটে যোগদান — এই দলবদলগুলি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

  11. বিধায়ক না থেকেও CM: নীতীশ কুমার বিগত ৩০ বছরে কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। বিহারে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য আইন পরিষদের (MLC) সদস্যপদ যথেষ্ট, যার ভিত্তিতে তিনি বারবার এই পদে আসীন হয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা:

নীতীশ কুমারের স্ত্রী মঞ্জু সিনহা তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের আন্তঃবর্ণের বিয়ে হয়েছিল (নীতীশ ওবিসি এবং মঞ্জু কায়স্থ পরিবারের সদস্য)। ২০০৭ সালে তাঁর স্ত্রী মারা যান। নীতীশ কুমার তাঁর স্ত্রীকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর সময় তিনি দিল্লিতে ছিলেন না এবং তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি। স্ত্রীর মৃতদেহ চিতায় নিয়ে যাওয়ার পুরো যাত্রা জুড়ে তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন বলে জানা যায়।