রাজ্যে কোথাও এমনটা হয় না! সাড়ে তিনশো বছরের প্রথা ‘কালীদৌড়’, বিসর্জনের আগে মা কালীদের শেষ সাক্ষাৎ!

শুরু হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে। মালদার চাঁচল ২ নম্বর ব্লকের মালতিপুরে আজও প্রতি বছর কালীপুজোর পরের রাতে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী ‘কালীদৌড়’। চাঁচলের তৎকালীন রাজা শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরীর হাতে শুরু হওয়া এই প্রথা এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন স্থানীয়রা।

মঙ্গলবার রাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এলাকার সাতটি কালীপ্রতিমা—শ্যামা কালী, চনকা কালী, হাট কালী, হ্যান্টা কালী, বুড়ি কালী ও বাজার কালী—অংশ নেয় এই দৌড়ে।

বিসর্জনের আগে ‘মায়েদের শেষ সাক্ষাৎ’

প্রথা অনুযায়ী, বিসর্জন যাত্রার আগে এই সাতটি প্রতিমাকে কাঁধে চাপিয়ে মালতিপুর গ্রাম ঘোরানো হয়। এরপর একে একে তারা উপস্থিত হয় মালতিপুরের দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণে। সেখানেই একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায় প্রতিটি প্রতিমা। স্থানীয়দের কাছে এটি হলো বিসর্জনের আগে ‘মায়েদের শেষ সাক্ষাৎ’।

দীর্ঘ সময় ধরে মন্দির প্রাঙ্গণে চলে জমকালো আতশবাজি পোড়ানোর পালা। এরপর পাটকাঠির তৈরি মশাল বা হুকাহুকিতে আগুন ধরিয়ে শুরু হয় প্রতীক্ষিত কালীদৌড়। কাঁধে প্রতিমা নিয়ে এলাকার মানুষজন দৌড়ে পৌঁছান গ্রামের পুকুর ঘাটে, যেখানে বিসর্জন সম্পন্ন হয়।

ঐতিহ্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

শোনা যায়, একসময় রাজা শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরী সপরিবারে হাতিতে চেপে রাজবাড়ি থেকে মালতিপুরে আসতেন এই কালীদৌড় দেখতে। এখন স্থানীয়রাই এই প্রথাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই অনুষ্ঠানে শুধু হিন্দুরাই নন, ইসলাম-সহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষজনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। বাস্তবিক অর্থেই এই অনুষ্ঠানে ফুটে ওঠে এলাকার বিরল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি।

মালদা জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি এটিএম রফিকুল হোসেন বলেন, “এই প্রথা দীর্ঘদিনের। উত্তরবঙ্গ তো বটেই, রাজ্যের কোথাও আর এমন কালীদৌড় প্রথা চালু রয়েছে কি না আমার জানা নেই। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ এই জেলার মাথা উঁচু করে।”

এবারই প্রথম এই প্রথা দেখতে মালদা শহর থেকে এসেছিলেন লিপি সরকার। তিনি জানান, “খুব ভালো লাগল। এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। এত মানুষ আসে ধারণা ছিল না। চারদিকে শুধু মানুষের মাথা আর মাথা।” দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে প্রতি বছরই এই কালীদৌড় এক মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তার জন্য বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন ছিল।