চকলেট বোমার রানি! কালীপুজোর ‘বুড়িমা’ আসলে কে? বাজির সাম্রাজ্যের সেই কিংবদন্তি নারীকে চেনেন?

দীপাবলি বা কালীপুজো এলেই একটা নাম সবার মুখে ফেরে—বুড়িমা। এই নামেই আমাদের বাবা-কাকা থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মও চেনে বাজির একচ্ছত্র সম্রাটকে। একটা সময় ছিল যখন বুড়িমার চকলেট বোমা ছাড়া কালীপুজো যেন ফিকে লাগত। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে দেশের জয়ের পর পাড়ায় পাড়ায় ফাটা সেই ‘বুড়িমা’ আজ শব্দবাজির নিষেধাজ্ঞায় লুপ্তপ্রায় হলেও, আতশবাজির বাজারে তিনি আজও কিংবদন্তি। কিন্তু কে এই ‘বুড়িমা’? বাজির সাম্রাজ্যের এই রানিকে ক’জন চেনেন?

যাঁর হাতে তৈরি হয়েছিল বাজির এই বিরাট সাম্রাজ্য, তাঁর আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় জন্ম তাঁর। দেশভাগের পর তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে আসেন। তৎকালীন দিনাজপুর জেলার ধলদিঘি সরকারি ক্যাম্প থেকে তাঁর ঠাঁই হয় হাওড়ার বেলুড়ে। সেখানেই শুরু হয় এক গরিব ঘরের অভাবী মানুষের জীবনযুদ্ধ। এই অন্নপূর্ণা দাসই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন সফল ব্যবসায়ী ‘বুড়িমা’।

স্বামী সুরেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর এপারে এসে প্রথমে গঙ্গারামপুরে থাকার সময় সংসারের হাল ধরতে বিড়ি বাঁধার কাজ শেখেন এবং ছোট একটি কারখানাও গড়েন।

আলতা-সিঁদুর থেকে বাজি! কীভাবে শুরু?

গঙ্গারামপুর থেকে হাওড়ার বেলুড়ে মেয়ের বাড়িতে এসে প্যারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে একটি দোকানঘর ভাড়া নেন তিনি। প্রথমে আলতা-সিঁদুরের ব্যবসা শুরু করলেও, এর সঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি, দোলযাত্রায় রং এবং কালীপুজোর সময় বাজি বিক্রি করতেন। প্রথম দিকে তিনি বাজি তৈরি করতেন না, কিনে এনে বিক্রি করতেন।

তবে বাজির ব্যবসায় লাভের অঙ্ক দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যদি নিজে বাজি তৈরি করতে পারেন, তবে রোজগার আরও বাড়বে। যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ। বাকি সব ব্যবসা ছেড়ে শুধু বাজির দিকে ঝুঁক লেন তিনি। বাঁকড়া, নুঙ্গি ও বজবজ ঘুরে ঘুরে শেখেন বাজি তৈরির কৌশল। যদিও ততদিনে বয়স বেড়েছে, তবুও কিছু করে দেখানোর অদম্য তাগিদে টেক্কা দিতেন তরুণদেরও।

জানা যায়, বাঁকড়ার আকবর আলি নামে এক ব্যক্তি তাঁকে হাতে ধরে চকলেট বোম বানানো শেখান। তারপর বোমের শব্দের মতোই দ্রুত তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর দোকানে বাজি কিনতে আসা মানুষজন অন্নপূর্ণা দেবীকে ভালোবেসে ‘বুড়িমা’ বলে ডাকতেন। সেই ডাক থেকেই তাঁর বাজির ব্যবসার নাম হয় ‘বুড়িমা’। বুড়িমার চকলেট বোম সেই সময় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়।

১৯৯৫ সালে অন্নপূর্ণা দেবীর প্রয়াণ হলেও, তাঁর তৈরি ‘বুড়িমা ফায়ার ওয়ার্কস’-এর সাম্রাজ্য আজও চলছে। বর্তমানে ডানকুনি, নুঙ্গি, চম্পাহাটি ও তামিলনাড়ুর শিবকাশীতে বুড়িমার কারখানা রয়েছে। এখন তাঁর দুই নাতি সুমন দাস ও রমন দাস, এবং নাতির ছেলে সুমিত দাস এই ব্যবসা সামলান।

শব্দদূষণের কারণে চকলেট বোম হয়তো আজ লুপ্তপ্রায়। কিন্তু দেশলাই ও অন্যান্য আতশবাজি তৈরি করে ‘বুড়িমা ফায়ার ওয়ার্কস’ আজও বাংলার বাজির বাজারে এক কিংবদন্তি। তিনি কেবল একজন উদ্যোগপতি নন, তিনি এক অন্নপূর্ণা, যিনি লড়াই করে তাঁর পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছিলেন।