পুরুষ ঢাকিদের টেক্কা দিয়ে কাঁধে ঢাক, বার্নপুরের ধেনুয়া গ্রামে দৃষ্টান্ত গড়ল শাশুড়ি-বৌমাদের যৌথ পরিবার

‘ঢাকে পড়ল কাঠি, পুজো হল জমজমাটি’—এই উৎসবের দিনে দুর্গাপূজা মানেই এতদিন ছিল পুরুষ ঢাকিদের শহরমুখী হওয়া। তবে বর্তমান সময়ে দেখা মিলছে এক ব্যতিক্রমী চিত্র। পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারাও এখন কাঁধে ঢাক তুলে নিচ্ছেন এবং রীতিমতো টেক্কা দিচ্ছেন পুরুষ ঢাকিদের।
পশ্চিম বর্ধমানের বার্নপুরের ধেনুয়া গ্রামের বাদ্যকর পাড়ায় দেখা মিলল এমনই এক যৌথ পরিবারের মহিলা ঢাকি দলের। যেখানে পরিবারের পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে মহিলারাও ঢাক বাজাতে নেমেছেন পরিবারের সচ্ছলতা আনতে।
যৌথ পরিবারের ঢাকের বোল: তিনটে ঢাক একসঙ্গে
এই ঢাকি দলের মহিলারা শুধু ঢাক বাজাচ্ছেন না, তাঁরা নানান ধরনের কসরতও দেখাচ্ছেন। দু’জন ঢাকির কাঁধে চড়ে দু-তিনটে ঢাক একসঙ্গে নিয়ে দিব্যি বাজিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। এমনকি একজন মহিলা একসঙ্গে তিনটি ঢাকেও বোল তুলছেন!
তাঁদের দলে রয়েছেন মোট ১৭ জন সদস্য। এদের মধ্যে রয়েছেন একই পরিবারের বৌমা, শাশুড়ি ও ননদরা। কারও বয়স কুড়ি, কারও আবার চল্লিশ। ঘরকন্নার কাজ সামলে গত একবছর ধরে নিষ্ঠা মেনে অনুশীলন করেছেন এই মহিলারা। এখন শুধু আসানসোল শিল্পাঞ্চল নয়, জেলা জুড়েই তাঁদের ডাক পড়েছে।
কটাক্ষ পেরিয়ে হাতেখড়ি
বাদ্যকর বাড়ির নববধূ মাম্পি বাদ্যকর জানান, শ্বশুরবাড়িতে ঢাক বাজানোর রীতি থাকলেও, তিনি পুজো কার্নিভালে মহিলাদের ঢাক বাজাতে দেখেই অনুপ্রাণিত হন। পরিবারের প্রবীণ সদস্য জিতেন বাদ্যকরের হাতেই তাঁদের ঢাকের বোলে হাতেখড়ি হয়।
মাম্পি জানান, শুরুর দিকে পাড়ার লোকেরা কটাক্ষ করলেও, তাঁরা থেমে থাকেননি। জিতেন মাস্টার পুত্রবধূসম মাম্পি, তনু, কাজল সবাইকে তালিম দিয়েছেন। বর্তমানে এই মহিলারা ঢাক বাজানোর সমস্ত কৌশল রপ্ত করে নিয়েছেন।
ঝাড়খণ্ড থেকে বর্ধমান, বাড়ছে বায়না
চলতি বছর রাম নবমীর দিন একটি রাজনৈতিক শোভাযাত্রায় একযোগে ১২ জন মহিলা পেশাদারি ভঙ্গিতে ঢাক বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে বার্নপুর শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের ডাক পড়তে থাকে। মনসা পুজো, গণেশ পুজো, বিশ্বকর্মা পুজো – বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাক বাজিয়েছেন তাঁরা।
তাঁরা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান এমনকি ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ ও দেওঘরেও ঢাক বাজিয়ে এসেছেন। এবারের পুজোয় কুমারপুর, চলবলপুর, ঝাড়খণ্ডের জামতারা, ধানবাদের পুজোয় বায়না পেয়েছেন। বিশেষ করে নবপত্রিকা আনতে যাওয়া এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রার বায়নাই বেশি।
প্রশিক্ষক জিতেন বাদ্যকর জানান, “মা-মেয়েদের সকালে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজকর্ম, অন্যের বাড়িতে দিনমজুরিও খাটতে হয়। তারপরেও সময় বের করে মহড়া দেওয়ার কাজ চলছে।”
মাম্পি বাদ্যকর বলেন, “আমরা আনন্দের সঙ্গে উপার্জন করতে পারছি ঢাক বাজানোর মাধ্যমে। পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঢাক বাজাতে শুরু করেছি, এটা বেশ আনন্দের। মনে হয় প্রতিদিনই আমাদের উৎসব।” শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সেজে এই মহিলা ঢাকিরা সমাজের বুকে এক নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন।