গুরগাঁও থেকে ফিরলেন পরিযায়ী শ্রমিকরা, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও কাজের অভাবের যন্ত্রণা

সোমবারের পর মঙ্গলবার সকালেও হরিয়ানার গুরগাঁও থেকে বাসে করে দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুর জেলার বহু পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফিরেছেন। তাদের চোখে-মুখে দীর্ঘ পথের ক্লান্তি আর গত কয়েক দিনের আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। ফিরে আসা শ্রমিকদের কথায় উঠে এসেছে ভিন্ রাজ্যে বাঙালি শ্রমিকদের প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ব্যবহার এবং নিজভূমে কাজের অভাবের কঠিন বাস্তবতা।
বুনিয়াদপুর পুরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের নারায়ণপুর এলাকায় বাস এসে থামতেই শ্রমিকরা দ্রুত নিজেদের গন্তব্যের দিকে রওনা দেন। কেউ বিডিও অফিস, কেউ পুরসভা, আবার কেউ অনলাইন ক্যাফেতে নিজেদের নথি যাচাই করতে ছুটছেন। তবে স্বস্তি নিয়ে ঘরে ফিরলেও তাদের মনে বাসা বেঁধেছে গভীর দুশ্চিন্তা। প্রশ্ন একটাই – এখানে কাজ কোথায়?
কাজের অভাব ও সরকারি ভাতার অপ্রতুলতা:
ফিরে আসা শ্রমিকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হলো রাজ্যে কাজের অভাব। তাদের অভিযোগ, রাজ্য সরকার থেকে কিছু ভাতা পেলেও সেই টাকায় সংসার চালানো অসম্ভব। মেয়েদের বিয়ে দেওয়া, সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া – এসব চিন্তায় তারা দিশেহারা। বাধ্য হয়েই তাদের ভিন্ রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়, যেখানে কাজের নিশ্চয়তা থাকলেও মেলে না সম্মান।
আইনউদ্দিন মিঞা নামে এক পরিযায়ী শ্রমিক বলেন, “আমার জন্ম এখানেই। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের অনেক সাহায্য করেন। কিন্তু তারপরও খেতে পাচ্ছি না। মেয়ের বিয়ে তো দিতে হবে। ভাতায় সংসার চলে না। তাই তো বাইরে যাচ্ছি।” তার এই কথা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকার কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
‘বাংলাদেশি’ তকমা ও পুলিশি নির্যাতন:
গুরগাঁও থেকে ফেরা শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভয়াবহ। বুনিয়াদপুর পুরসভার রাঙাপুকুর এলাকার এক পরিযায়ী শ্রমিকের অভিযোগ, তারা বংশানুক্রমিকভাবে এই এলাকার বাসিন্দা এবং তাদের কাছে সমস্ত বৈধ নথি রয়েছে। অথচ হরিয়ানায় তাদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, কারণ তারা বাংলায় কথা বলেন।
লিপিকা পারভিন নামে এক মহিলা শ্রমিক দিল্লির ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন, “দিল্লিতে কাজে গিয়েছিলাম। ওইখানে অত্যাচার করছে। মারছে বাঙালিদের। এমনকী বিহারীদের উপরও অত্যাচার করছে। কিছুই দেখছে না।” পুলিশি নির্যাতনের ভয়েই তারা বাধ্য হয়ে সবকিছু ফেলে জীবন বাঁচাতে বাড়ি ফিরেছেন বলে জানান শ্রমিকদের পরিবার।
এই ঘটনা আবারও পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি সামনে এনেছে। রাজ্য সরকার যদি জেলা স্তরে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তাহলে বারবার এমন বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা নিয়ে শ্রমিকদের ঘরে ফিরতে হবে, যা তাদের জীবন এবং জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।