“পদ্মশ্রীর বদলে কেউ যদি একটা ঘর দিতেন”-কাতর আর্তি বৃদ্ধের, সরকারকে জানালেন আর্জি

স্কুলের গণ্ডি না পেরোলেও গাছ লাগানোর অদম্য নেশা বাঘমুন্ডির প্রত্যন্ত গ্রাম সিন্দরির বাসিন্দা দুখু মাঝিকে নিয়ে গেছে রাইসিনা হিলসে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে তিনি গ্রহণ করেন পদ্মশ্রী সম্মান। এই সম্মান শুধু সিন্দরি নয়, গোটা জঙ্গলমহলের কাছেই এক চিরকালীন গর্বের কাহিনি। কিন্তু সেই গর্বের আড়ালে দুখু মাঝির বাস্তব জীবনটি এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে ভরা বর্ষায় তার মাথার উপর আক্ষরিক অর্থেই কোনো শক্তপোক্ত ছাদ নেই।

বর্ষার একটানা বৃষ্টিতে পুরুলিয়া জেলা যখন মাঝেমধ্যে ডুবে যাচ্ছে, তখন দুখু মাঝির মাটির খাপরার ছাউনি দেওয়া দুটো ঘর কার্যত নামমাত্র। বর্ষায় জল গিলে ফেলে তার এই নড়বড়ে ঘরগুলি। তারই মধ্যে প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে শম্ভু এবং সহধর্মিনী ফুনগি মাঝানকে নিয়ে দুখুর অভাবের সংসার। বড় ছেলে নির্মল অবশ্য আলাদা থাকে।

সামনের এক চিলতে ঘরের ছাউনির মাটির খাপরা ভেঙে যাওয়ায় ত্রিপল দিয়ে ঢাকতে হয়েছে চালা, তাতেও স্বস্তি নেই। টানা বর্ষায় মাটির দেওয়ালের একাধিক জায়গার প্রলেপ ধুয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় ফাটল। দেওয়ালের বাইরে বাঁশ পুঁতে কোনোমতে ঘরকে ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। দুখু আক্ষেপ করে বলেন, “সামনের ঘরের চালার খাপরা ভেঙে যাওয়ায় ত্রিপল ঢাকা দিয়েছি। তা–ও সবটা পারিনি।” পাশে দাঁড়ানো তার সহধর্মিনী ফুনগি মাঝান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ক’দিন আগে সারারাত ধরে জোর বৃষ্টি হচ্ছিল। ভয়ে ঘুমাতে পারিনি, যদি বাড়িটা ভেঙে পড়ে!”

পদ্মশ্রীর বিনিময়ে একটি ঘরের আর্তি:

একটু থেমে দুখু ফের বলেন, “গাছ লাগানোর সুবাদে পেয়েছি পদ্মশ্রী সম্মান। কত মানুষ দেখা করে গিয়েছেন। সবাইকে অনুরোধ করেছি একটা ভালো ঘর করে দিতে, কিন্তু কিছুই হয়নি।” তিনি যোগ করেন, “এখন মনে হয়, পদ্মশ্রীর বদলে কেউ যদি একটা ঘর দিতেন, তা হলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হতো।”

দুখু মাঝির গাছ লাগানোর নেশা শুরু হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই, যখন তিনি বাবা মঙ্গল মাঝির সঙ্গে দিনমজুরের কাজ করতে গিয়েছিলেন। দুখুর কথায়, “একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে। সেখানেই প্রথম শুনি গাছ না–বাঁচালে আমরা অক্সিজেন পাব না। আমি তো লেখাপড়া শিখিনি, তাই অক্সিজেন কী অথবা কী ভাবে গাছ তা দেয়, সে সব বুঝতাম না। তবে মনে হলো, গাছ লাগাতে হবে চারপাশে।” সেই থেকেই তার সবুজের অভিযান শুরু।

অদম্য সবুজ যোদ্ধা:

বন দপ্তরের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, চড়িদা-বীরগ্রামের রাস্তা, ডাভা-সিন্দরি রাস্তা সমেত এলাকার একাধিক রাস্তার পাশে আজও যে বড় গাছগুলি রয়েছে, তার অধিকাংশই রোপণ করেছেন দুখু। এলাকার ফাঁকা জমিতে তিনি বট, অশ্বত্থ, পলাশ, শিমূল–সহ আরও নানা ধরনের গাছ লাগিয়েছেন, যা তার অদম্য সবুজ প্রেমকে প্রমাণ করে।

ঘরের মধ্যে রং-চটা টিনের বাক্সে এখনও পড়ে রয়েছে তার পদ্ম-সম্মান, ফলক। তার স্ত্রী বলেন, “এগুলোও যে কোথাও রাখব, সেই উপায়ও নেই। থলের মধ্যেও ভরে রাখতে হয়।”

সরকারি প্রকল্পের জটিলতা:

বাঘমুন্ডির বিডিও আর্য তা বলেন, “আবাস প্রকল্পে ইতিমধ্যে একটি বাড়ি পেয়েছেন তিনি, তবে সেখানে ওঁর বড় ছেলে থাকে। একটিই তো হাউসহোল্ড, সেখানে কী ভাবে ওঁর নাম যুক্ত হবে? তিনিই তো পরিবারের কর্তা।” প্রশাসনিক জটিলতার বেড়াজালে দুখু মাঝির মতো পদ্মশ্রী প্রাপকও একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা সমাজের জন্য এক গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

দুখু মাঝি অবশ্য নিজের কাজ আগের মতোই করে চলেছেন। তিনি বলেন, “কী হবে জানি না। আমি নিজের কাজ আগের মতোই করে চলেছি। যা হওয়ার, তা হবে।” তার এই অদম্য স্পৃহা এবং সরলতা এক ভিন্ন বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছে।