জামাই ও নাতির বাবা একই লোক! পূর্ব বর্ধমানের ভোটার তালিকায় ‘অদ্ভূতুড়ে কাণ্ড’

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন উঠে এসেছে। এবার পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামে ভোটার তালিকায় ধরা পড়েছে এক ‘অদ্ভূতুড়ে কাণ্ড’, যেখানে একই ব্যক্তিকে তার জামাইয়ের বাবা এবং নাতির বাবা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই ঘটনায় শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বাংলাদেশের সঙ্গে অবৈধ যোগসূত্রের অভিযোগও উঠেছে, যা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
সম্পর্কের জট, আধারের ভুল:
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কালাচাঁদ মণ্ডল, যিনি বাংলাদেশের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে খবর, বাংলাদেশে কালাচাঁদ মণ্ডল ও দুলাল মণ্ডলের সম্পর্ক শ্বশুর-জামাই। কিন্তু কেতুগ্রামের ভোটার তালিকায় অবিশ্বাস্যভাবে তাঁদের বাবা-ছেলে হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই ভাবে, বাংলাদেশের কালাচাঁদ মণ্ডল ও দুর্জয় মণ্ডলের সম্পর্ক দাদু-নাতির হলেও, এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় তাঁদেরও বাবা-ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সম্পর্কের গরমিলে শুধু ভোটার তালিকার ভুলই নয়, এর ভিত্তিতে আধার কার্ড এবং রেশন কার্ডও বানানো হয়েছে, যা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উপর বড় প্রশ্ন তুলেছে। এই বিষয়ে কালাচাঁদ বাবুর অদ্ভুত যুক্তি, “জামাই তো বাবা বলতেই পারে শ্বশুরকে। তাতে তো সমস্যা নেই। কিন্তু নাতি বাবা বলতে পারে না।” তার এই বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রশাসনের গাফিলতি না ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’?
একটি ভোটার তালিকা তৈরি করতে গেলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির যাবতীয় নথি, যেমন ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, ইত্যাদি প্রশাসনের কাছে জমা দিতে হয়। এরপরও এমন মারাত্মক ভুল কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটা নিছকই প্রশাসনিক গাফিলতি নাকি এর পেছনে ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ রয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। কারণ, একই ব্যক্তি কীভাবে নিজের জামাইয়েরও বাবা এবং নাতিরও বাবা—এই অদ্ভুত সম্পর্কে ভোটার তালিকায় যুক্ত হতে পারেন, তা সাধারণ বুদ্ধিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজনৈতিক চাপানউতোর: বিজেপি বনাম তৃণমূল:
এই অদ্ভূতুড়ে ভোটার তালিকা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনার জন্য সরাসরি বিজেপিকে দায়ী করছে। তাদের দাবি, বিজেপি মোটা টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে ‘ভুয়ো ভোটার’ ঢুকিয়ে, এখানকার ভোটে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, বিজেপি এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সীমা ভট্টাচার্য বলেন, “বিজেপি তো ক্ষমতায় ছিল না। বিজেপি তো ভোটার তালিকা তৈরি করেনি। তৃণমূল দেখলে পালে হাওয়া নেই, মানুষ তাদের সঙ্গে নেই, এখন কিছু তো বলতে হবে, তাই এসব বলছে।”
অনুপ্রবেশ বিতর্ক ও বিধানসভা ভোটের আগে উদ্বেগ:
মোটা টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে আসা লোকেদের হাতে ভোটার কার্ড পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ অনেকদিন ধরেই উঠছে। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ থেকেও এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে তৃণমূলের নাম জড়িয়েছে। যদিও তৃণমূল নেতারা সেই অভিযোগ খারিজের চেষ্টা করেছেন। কেতুগ্রামের তৃণমূল বিধায়ক শেখ শাহনওয়াজ বলছেন, “বাংলাদেশ থেকে ভুয়ো ভোটার ঢুকিয়ে এখানে চক্রান্ত করতে চাইছে। আমরা দেখছি, সতর্ক রয়েছি। প্রশাসনকে বলব খেয়াল রাখতে। কালাচাঁদ মণ্ডল বিজেপি সমর্থক।”
২৬-এর বিধানসভার আগে বারবার ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় রাজ্যের নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে বরাবরই সরব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন বাংলাভাষীদের হেনস্থার প্রতিবাদে পথে নামলেন, সেদিনই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দফতরে গিয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান পেশ করে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, অনুপ্রবেশের ফলে রাজ্যের জনবিন্যাস পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই ঘটনাগুলো পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভোটার তালিকা এবং অনুপ্রবেশের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে, যা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।