AC-বাসে একই রুটে ডাবল ভাড়া! প্রশ্নের মুখে পরিষেবা, অভিযোগ যাত্রীদের

কলকাতা থেকে দূরপাল্লার এসি ভলভো বাসের ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একই রুটে, এমনকি একই বাসেও যাওয়া-আসার ভাড়ায় ব্যাপক তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। পরিবহণ দপ্তরের নির্ধারিত ভাড়া অমান্য করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি বাস মালিকদের বিরুদ্ধে।
শ্যামবাজারের বাসিন্দা প্রীতি চৌধুরী সম্প্রতি কলকাতা থেকে দিঘা যাওয়ার জন্য একটি অ্যাপ থেকে এসি ভলভো বাসের টিকিট কেটেছিলেন ৬০০ টাকায়। অথচ, সোমবার তিনি একই বাসে দিঘা থেকে কলকাতায় ফিরেছেন মাত্র ৩০০ টাকায়। অর্থাৎ, ফেরার পথে তাঁকে অর্ধেক ভাড়া দিতে হয়েছে।
শুধু প্রীতি নন, নিউ আলিপুরের তমাল চট্টোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতাও একইরকম। কয়েক মাস আগে তিনি ধর্মতলা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার জন্য এসি ভলভো বাসের টিকিট কেটেছিলেন ৩৪০০ টাকা দিয়ে। অথচ, একই বাসে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় ফিরেছেন মাত্র ১৭০০ টাকায়। কাশীপুরের বাসিন্দা বিপ্লব দত্ত, যাঁকে কর্মসূত্রে প্রায়শই শিলিগুড়ি যেতে হয়, তিনি জানান, “উত্তরবঙ্গের ট্রেনের টিকিট কোনো সময়েই মেলে না। ফলে, বাসে যাতায়াত করি। কিন্তু, ভাড়া নির্দিষ্ট নয়। সোমবার যে বাসে শিলিগুড়ি যাই ২ হাজার টাকায়, সেই একই বাসে রবিবারে ৫ হাজার টাকার টিকিট কেটেও ফিরতে হয়েছে।”
পরিবহণ দপ্তরে অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে নিয়ন্ত্রণের অভাব
পরিবহণ সংস্থার অনুমোদন নিয়েই এই বাসগুলো রাস্তায় চলে। তা সত্ত্বেও ভাড়ার ক্ষেত্রে কেন এই বিশাল তারতম্য, তা নিয়ে বেশ কয়েকজন যাত্রী সম্প্রতি পরিবহণ দপ্তরে অভিযোগ জানিয়েছেন। কেন ভাড়ার ওপর পরিবহণ দপ্তরের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, সেই প্রশ্নও তুলছেন তাঁরা।
যাত্রীদের অভিযোগ, কলকাতা থেকে দিঘাগামী ট্রেনের সংখ্যা হাতে গোনা। তাই দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুর যাওয়ার জন্য অনেকটাই বাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ যাওয়ার জন্য একাধিক ট্রেন থাকলেও, হঠাৎ করে দার্জিলিং বা শিলিগুড়ি যাওয়ার প্রয়োজন হলে ট্রেনের টিকিট পাওয়া কঠিন। ফলে বাধ্য হয়েই বাসের ওপর ভরসা করতে হয়। এই সুযোগে দূরপাল্লার ভলভো রুটের বাস মালিকদের একাংশ “ঝোপ বুঝে কোপ মারছেন” বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
এ প্রসঙ্গে পরিবহণ মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, “খুব শীঘ্রই দূরপাল্লা বাস সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমরা বৈঠকে বসব। সেখানে তাঁদের সতর্ক করা হবে। তারপরেও একই অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যাত্রীদের একাংশের অভিযোগ, কলকাতা থেকে দিঘা, পুরী, শিলিগুড়ির এসি ভলভো বাসের টিকিটের দাম সবচেয়ে বেশি থাকে ছুটির দিন এবং উৎসবের সময়ে। ২০১৮ সালে পরিবহণ দপ্তর দূরপাল্লার বাসের ভাড়ার তালিকা নির্দিষ্ট করে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল। তাতে এসি ভলভো বাসের ক্ষেত্রে কিলোমিটার পিছু ২.২০ টাকা এবং নন-এসির ক্ষেত্রে ২ টাকা ভাড়া ঠিক করে দেওয়া হয়। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব প্রায় ৫৭৫ কিলোমিটার। সরকারি হিসেবে ভাড়া হওয়া উচিত প্রায় ১২৬৫ টাকা। কিন্তু, বাস্তবে সেই ভাড়া ১৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকিটের চাহিদা অনুযায়ী দাম বাড়ানোর এই নিয়মকে বলা হয় ‘ডায়নামিক ফেয়ার’। নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই ভাড়া বৃদ্ধির অঙ্ক কষা হয়। উড়ানের টিকিটের ক্ষেত্রেও ‘ডায়নামিক ফেয়ার’ কার্যকর হয়ে থাকে। এই পদ্ধতির ফলে যাঁরা অনেক আগে টিকিট কাটেন, তাঁরা তুলনামূলক কম দামে টিকিট পান, আর যাঁরা কাছাকাছি সময়ের টিকিট কাটেন, তাঁদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এছাড়াও, শনি-রবিবার এবং অন্যান্য ছুটির দিনে টিকিটের দাম বাড়িয়ে নেওয়া হয়।
শ্যামলী পরিবহণের মালিক অরুণ কুমার ঘোষ এই বিষয়ে নিজের যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, “সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। কারণ, এসি ভলভো বাসের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেশি। তেলের দামও ক্রমশ বাড়ছে। সে কারণেই ডায়নামিক ফেয়ার।” তিনি আরও বলেন, উড়ানের ভাড়াও তো একই রুটে সবদিন এক থাকে না, ট্রেনের ক্ষেত্রেও তৎকাল, প্রিমিয়াম তৎকালে ভাড়ার তারতম্য ঘটে, তাহলে বাসে সমস্যা কেন?
তথ্যসূত্র: এই সময়