মৃতদের আধারে জালিয়াতির ফাঁক? ১৪ বছরে নিষ্ক্রিয় মাত্র ১.১৫ কোটি, UIDAI-র পরিসংখ্যানে উদ্বেগ

প্রায় ১৪ বছর আগে দেশে আধার কার্ড চালু হলেও, এখন পর্যন্ত মাত্র ১.১৫ কোটি আধার নম্বর নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে একটি আরটিআই (Right to Information) আবেদনের জবাবে, যা ইন্ডিয়া টুডে টিভি-র মাধ্যমে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI) প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বার্ষিক মৃত্যুহারের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যা মৃত মানুষের আধার নম্বর সচল থাকার এবং এর মাধ্যমে সরকারি প্রকল্প ও পরিষেবাগুলিতে জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পরিসংখ্যানের অসঙ্গতি: মৃত মানুষের আধারের পরিণতি কী?
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত UIDAI-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট আধারধারীর সংখ্যা ১৪২.৩৯ কোটি। অন্যদিকে, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UN Population Fund) এপ্রিল ২০২৫-এর হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৪৬.৩৯ কোটি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, সরকারি সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (CRS) অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতে প্রতি বছর গড়ে ৮৩.৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই হিসাবে, গত ১৪ বছরে দেশে প্রায় ১১.৬৯ কোটি মানুষ মারা গেছেন। অথচ, UIDAI বাতিল করেছে মাত্র ১.১৫ কোটি আধার নম্বর—যা সম্ভাব্য মৃত্যুর মাত্র ১০ শতাংশেরও কম। এই বিশাল ফারাকই প্রশ্ন তুলছে আধার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
কেন আধার নিষ্ক্রিয় হচ্ছে না?
UIDAI জানিয়েছে যে, আধার নম্বর নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া এখনও বেশ জটিল এবং ধীরগতির। এটি মূলত রাজ্য সরকারের মৃত্যুসনদ, হাসপাতালের রেকর্ড বা পরিবারের পক্ষ থেকে রিপোর্টিং-এর উপর নির্ভরশীল। ফলে বহু ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তির আধার নম্বর বাতিল করা হয় না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, UIDAI স্বীকার করেছে যে তারা মৃত ব্যক্তিদের আধার নম্বর সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট ডেটা রাখে না। এর অর্থ হলো, অজান্তেই বহু মৃত ব্যক্তির পরিচয় বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক পরিষেবায় ব্যবহৃত হতে পারে, যা ব্যাপক জালিয়াতির পথ খুলে দিচ্ছে।
কী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এই ফাঁকফোকরে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গুরুতর অসঙ্গতির কারণে নিম্নলিখিত ঝুঁকিগুলো তৈরি হতে পারে:
সরকারি প্রকল্প ও ভর্তুকিতে জালিয়াতি বা দুর্নীতি: মৃত ব্যক্তির নামে রেশন, পেনশন বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা আত্মসাৎ করা হতে পারে।
একই পরিচয়ে একাধিক পরিষেবা গ্রহণ: একজন মৃত ব্যক্তির আধার ব্যবহার করে একাধিক স্থানে পরিষেবা গ্রহণ সম্ভব হতে পারে।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও অন্যান্য আর্থিক পরিষেবার অপব্যবহার: মৃত মানুষের নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা বা আধার সংযুক্ত অন্য পরিষেবায় আর্থিক জালিয়াতি হতে পারে।
জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তি: ডেটাবেসের অসঙ্গতি সঠিক জনগণনার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সমাধানের রাস্তা কী?
বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যার সমাধানে কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন:
আধার ডেটাবেস ও মৃত্যুর রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের মধ্যে সরাসরি ইন্টিগ্রেশন: UIDAI এবং মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি স্বয়ংক্রিয় ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাজ্য সরকার ও স্বাস্থ্য পরিসেবা বিভাগের সঙ্গে UIDAI-এর সমন্বয় বৃদ্ধি: ডেটা বিনিময়ে রাজ্য সরকার ও স্বাস্থ্য খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
নিয়মিত ‘ডেথ অডিট’ ও আধার আপডেট সিস্টেম তৈরি: নির্দিষ্ট সময় অন্তর ডেটাবেস নিরীক্ষা করে মৃত ব্যক্তিদের আধার চিহ্নিত করে বাতিল করা।
ডিজিটাল মৃত্যু নিবন্ধনের বাধ্যতামূলকতা: ডিজিটাল পদ্ধতিতে মৃত্যু নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও বাধ্যতামূলক করা।
প্রযুক্তি নির্ভরতা যত বাড়ছে, পরিচয়পত্র ঘিরে জালিয়াতির সম্ভাবনা ততই বাস্তব হচ্ছে। ১৪ বছরে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হলেও, সেই অনুপাতে আধার বাতিলের হার চরমভাবে পিছিয়ে। তাই আধার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই ফাঁকফোকর দ্রুত বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই অসঙ্গতি দূর করা না গেলে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্রই ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।