মালদায় অস্ত্রের আস্ফালন, আতঙ্কে জনজীবন, রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে

আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি আর লাগাতার খুনের ঘটনায় মালদা জেলাজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলতি বছরে একাধিক হত্যালীলা, যার মধ্যে জেলা তৃণমূলের দাপুটে সহ-সভাপতি দুলাল সরকারকে নৃশংসভাবে গুলি করে খুন করার ঘটনাটিও রয়েছে, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি বাড়িয়ে তুলেছে। পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে, পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ প্রবেশই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
লাগামহীন অস্ত্রের রমরমা
চলতি বছরে মালদা জেলা পুলিশ এ পর্যন্ত ৭১টি আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই বিহারের মুঙ্গের এবং ঝাড়খণ্ডের যোগসূত্র মিলেছে। মাত্র ১০ হাজার টাকায় পাইপগান এবং ৪০-৫০ হাজার টাকায় অত্যাধুনিক পিস্তল পাওয়ার খবর ব্যবসায়ীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। প্রতি পিস কার্তুজ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় হাতের নাগালে চলে আসায় দুষ্কৃতীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জয়ন্ত কুণ্ডু উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকায় আমরা আতঙ্কে ভুগছি। কিছু কিছু এলাকায় ব্যবসায়ীরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। জেলাজুড়ে বিহার-ঝাড়খণ্ড থেকে আসা দুষ্কৃতীদের সংখ্যা বাড়ছে।” তিনি পুলিশি পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও, আরও কঠোর নজরদারির দাবি তুলেছেন।
পুলিশের বক্তব্য: তৎপরতা সত্ত্বেও চ্যালেঞ্জ
মালদা জেলার পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব জানান, “চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ৪১টি কেসে ৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৭১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৬টি ম্যাগাজিন, ১২৪টি কার্তুজ। বৈষ্ণবনগর, কালিয়াচক, মানিকচক ও ইংরেজবাজার থানা এলাকা থেকে বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।” তিনি আরও বলেন যে, উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রগুলির সঙ্গে বিহারের মুঙ্গেরের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু মধ্যস্বত্বভোগীও এই কারবারের সঙ্গে জড়িত। মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলি আনা হচ্ছে বলে পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন। আগ্নেয়াস্ত্রের কারবার রুখতে জেলা পুলিশ তৎপর রয়েছে এবং সন্দেহজনক লোকজন ও পাচারের রুটগুলিতে নজরদারি চালানো হচ্ছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
রাজনৈতিক তরজা: কাঠগড়ায় প্রশাসন ও বিজেপি-তৃণমূল
মালদায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর। গেরুয়া শিবির সরাসরি পুলিশ প্রশাসনকেই কাঠগড়ায় তুলেছে। বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মালদা জেলার শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যখনই বড় কোনও ঘটনা ঘটছে, রাজ্য সরকার বহিরাগত লোক, বাইরে থেকে আগ্নেয়াস্ত্র আসার গল্প তুলে ধরছে। সেসব যদি বাস্তবও হয়ে থাকে, তবে আন্তঃরাজ্য সীমান্তে পুলিশ কী করছে? আসলে প্রশাসনের একাংশও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা পুলিশকে কঠোরভাবে দুষ্কৃতীদের দমনের জন্য আবেদন জানাচ্ছি।”
পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ মৌসম নূর। তিনি বলেন, “যত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিহার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র আনা হচ্ছে। বিহার বিজেপি শাসিত এলাকা। ওখানকার দুষ্কৃতীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এদিকে চলে আসছে।” তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, “বারবার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের খুন হতে হচ্ছে। আমরা অনুমান করছি, এটা একটা বড় ষড়যন্ত্রও হতে পারে।” যদিও তিনি পুলিশকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার আবেদন করেছেন এবং আরও নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
মালদার এই আগ্নেয়াস্ত্র-কেন্দ্রিক অপরাধের বাড়বাড়ন্ত কবে নিয়ন্ত্রণে আসবে, সেদিকেই তাকিয়ে জেলার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল। রাজনৈতিক দোষারোপের ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপই পারে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে।