মালদায় অস্ত্রের রমরমা, আতঙ্কে ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ, কাঠগড়ায় পুলিশ-প্রশাসন!

চলতি বছরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মালদা জেলা জুড়ে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জেলা তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা দুলাল সরকার সহ একাধিক খুনের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার স্পষ্ট প্রমাণ করে দিয়েছে যে, পার্শ্ববর্তী রাজ্য থেকে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ মালদায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পুলিশি তদন্তে বিহারের মুঙ্গের এবং ঝাড়খণ্ডের যোগসূত্র উঠে আসায় এই সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

আগ্নেয়াস্ত্রের লাগামহীন আমদানি
মালদা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ৭১টি আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব জানিয়েছেন, ৪১টি মামলায় ৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে ৭১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৬টি ম্যাগাজিন ও ১২৪টি কার্তুজ। বৈষ্ণবনগর, কালিয়াচক, মানিকচক ও ইংরেজবাজার থানা এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এই সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস হিসেবে বিহারের মুঙ্গেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, ঝাড়খণ্ডের কিছু মধ্যস্বত্বভোগীও এই অবৈধ কারবারে জড়িত বলে জানা গেছে। পুলিশ সুপার আরও জানান যে, মূলত ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেই এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো আনা হচ্ছে।

পকেটসই দামে মারণাস্ত্র!
জেলা পুলিশের একটি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য আরও চাঞ্চল্যকর। মাত্র ১০ হাজার টাকাতেই নাকি পাইপগান মিলছে মালদায়! অত্যাধুনিক পিস্তলের দাম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতিটি কার্তুজ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এত কম দামে মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ভয়ের সৃষ্টি করেছে। মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি জয়ন্ত কুণ্ডু উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকায় আমরা আতঙ্কে ভুগছি। কিছু কিছু এলাকায় ব্যবসায়ীরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন।” তিনি পুলিশকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক চাপানউতোর: দায় কার?
অস্ত্রের রমরমা এবং লাগামহীন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও তুঙ্গে। গেরুয়া শিবির এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি পুলিশ-প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ, “মালদা জেলার শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দুলাল সরকারের মতো দাপুটে নেতাকেও খুন হতে হয়েছে। রাজ্য সরকার যখনই বড় কোনও ঘটনা ঘটছে, বহিরাগত লোক, বাইরে থেকে আগ্নেয়াস্ত্র আসার গল্প তুলে ধরছে। যদি তাই হয়, তবে আন্তঃরাজ্য সীমান্তে পুলিশ কী করছে? আসলে প্রশাসনের একাংশও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।” তিনি কঠোরভাবে দুষ্কৃতীদের দমনের জন্য পুলিশকে আবেদন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ মৌসম নূর বিজেপির অভিযোগ খারিজ করে পাল্টা দোষ চাপিয়েছেন। তাঁর দাবি, “যত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিহার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র আনা হচ্ছে। বিহার বিজেপি শাসিত এলাকা। ওখানকার দুষ্কৃতীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এদিকে চলে আসছে। বারবার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের খুন হতে হচ্ছে। আমরা অনুমান করছি, এটা একটা বড় ষড়যন্ত্রও হতে পারে।” তিনি পুলিশকে আরও নজরদারি বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন।

মালদার এই আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকা নির্বাহের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপই পারে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে জেলাকে মুক্তি দিতে।