মালদার সরকারি হোম থেকে ২ কিশোরীর পলায়ন, শিলিগুড়িতে আটক, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

মালদার সরকারি হোম ‘শৈশালি শিশুকন্যা আবাস’ থেকে নিখোঁজ হওয়া দুই কিশোরীকে অবশেষে শিলিগুড়িতে আটক করেছে পুলিশ। বিহারে পালানোর চেষ্টার সময় তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, যা মালদা জেলা প্রশাসনিক মহলে স্বস্তি এনেছে। তবে, এত কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে কীভাবে দুই নাবালিকা হোম থেকে পালাতে সক্ষম হলো, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনায় মালদার জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়া বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়া জানিয়েছেন, “এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশও আলাদাভাবে তদন্ত করছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য ওই হোমের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হবে। এ বিষয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা শুরু হয়েছে।”

কড়া নিরাপত্তা সত্ত্বেও পলায়ন:

২০১৯ সালে চালু হওয়া এই সরকারি হোমটি, যার পোশাকি নাম ‘শৈশালি শিশুকন্যা আবাস’, ছয় থেকে আঠারো বছর বয়সী মেয়েদের জন্য নির্মিত। হোমের চারদিকে উঁচু প্রাচীর, তার উপরে কাঁটাতার এবং গোটা চত্বরে সিসি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। নজরদারির জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষীও মোতায়েন রয়েছে। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও গত শনিবার ভোরে দুই নাবালিকা ওই হোম থেকে পালিয়ে যায়, যা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

পলাতক দুই কিশোরীর মধ্যে একজন মালদা শহরের ১৫ বছর বয়সী বাসিন্দা। অপরজন বিহারের ১৬ বছর বয়সী কিশোরী, যে একটি অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার দায়ে প্রায় এক বছর ধরে এই হোমে ছিল। মালদার কিশোরীটি মাত্র ন’দিন আগে প্রেমে পড়ে এক যুবকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল, যাকে পুলিশ উদ্ধার করে এই হোমে পাঠিয়েছিল।

সিসিটিভি ফুটেজে চোখ কপালে:

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের চোখ কপালে উঠেছে। ফুটেজে দেখা যায়, দুই নাবালিকা প্রথমে হোমের দোতলার বাথরুমে থাকা হাওয়া নিষ্কাশন পাখা খুলে ফেলে। সেই সরু জায়গা দিয়েই তারা হোমের বাইরে বেরোয়। এরপর কার্নিশ বেয়ে তারা একতলায় নামে। একটি লোহার ফ্রেমের সাহায্যে তারা প্রায় সাড়ে আট ফুট উঁচু প্রাচীরে উঠে যায় এবং অনায়াসে প্রাচীরের উপরে লাগানো কাঁটাতারের রিং পেরিয়ে বাইরে ঝাঁপ দেয়। এরপর একটি টোটো ধরে তারা সেখান থেকে চলে যায়।

পুলিশি তৎপরতায় আটক:

সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখার পর তদন্তকারীরা হোমের অন্য আবাসিকদের জেরা করতে শুরু করেন। মালদার এক নাবালিকার কথায় সন্দেহ হয় পুলিশের। ওই নাবালিকাকে দিয়ে তার মোবাইল ফোন থেকে এক পলাতক কিশোরীকে ফোন করান পুলিশ অফিসাররা। তখনই জানা যায়, হোম থেকে পালিয়ে দুই কিশোরী শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে এবং সেখান থেকে তারা বিহারের বাসিন্দা নাবালিকার বাড়িতে চলে যাবে।

জেলা পুলিশের এক কর্তা জানান, শনিবার হোম কর্তৃপক্ষের তরফে ইংরেজবাজার থানায় দুই কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরেই তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তারা শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটে যোগাযোগ করে এনজেপি স্টেশন ও তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ডে নজর রাখতে অনুরোধ করে। শনিবার বিকেলে ইংরেজবাজার থানার পুলিশের কাছে খবর আসে, এনজেপি স্টেশন সংলগ্ন একটি হোটেলে দুই সন্দেহভাজন কিশোরী খাবার খাচ্ছে। দ্রুত যোগাযোগ করে তাদের ছবি পাঠানো হয় এবং হোটেল মালিক তাদের শনাক্ত করেন। শিলিগুড়ি কমিশনারেটের পুলিশ দুই কিশোরীকে ওই হোটেলেই আটকে রাখে এবং রাতে ইংরেজবাজার থানার পুলিশ অফিসারদের হাতে তুলে দেয়। আজই দু’জনকে মালদা নিয়ে এসে জেলা আদালতে পেশ করে ফের হোমে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

এই ঘটনা সরকারি হোমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নজরদারি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিভাগীয় তদন্তে কী উঠে আসে, এখন সেটাই দেখার।