‘চাঁদা’ না দেওয়ায় পাথর দিয়ে থেঁতলে খুন, বাংলাদেশে চলছে চলছে চরম অরাজকতা?

পুরান ঢাকার জনাকীর্ণ মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) প্রকাশ্যে দিবালোকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে পুরো বাংলাদেশে। এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার বিচার চেয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রদল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

গত বুধবার (৯ জুলাই, ২০২৫) ঘটে যাওয়া এই জঘন্যতম ঘটনাটি সভ্য সমাজের কপালে এঁকে দিয়েছে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। সিসিটিভি ফুটেজ, মামলার বিবরণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের লোমহর্ষক বর্ণনায় উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র: লাল চাঁদকে ডেকে নিয়ে প্রথমে অমানবিকভাবে পেটানো হয়। এরপর ইট-পাথরের টুকরো দিয়ে তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। পাশবিকতার চরম সীমায় পৌঁছে তাঁকে বিবস্ত্র করে কয়েকজন হামলাকারী তাঁর শরীরের ওপর উঠে লাফাতে থাকে। এ যেন কোনো প্রতিশোধের নাটক, যা মঞ্চস্থ হয়েছে শত শত মানুষের চোখের সামনে।

তোলাবাজির থাবা নাকি পূর্বশত্রুতা?

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ তোলাবাজি। নিহত লাল চাঁদ একসময় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে, এ ঘটনায় যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ডিএমপি কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

মামলার জট ও আটককৃতরা

লাল চাঁদের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম (৪২) বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় বৃহস্পতিবার একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, এবং আরও ১৫-২০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন। পুলিশ ও র‍্যাবের সম্মিলিত অভিযানে এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান ওরফে মহিন নিজেকে যুবদল নেতা পরিচয় দিতেন এবং তারেক রহমান ওরফে রবিন নামে আরেকজন আটক হয়েছেন, যার কাছ থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার হয়েছে। রবিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।

দর্শক সারিতে দাঁড়িয়ে মানবতা?

এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিকটি হলো উপস্থিত জনতার নীরবতা। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, শতাধিক পথচারী ও রোগীর আত্মীয়রা হাসপাতালের গেটের ভেতর থেকে লাল চাঁদকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখলেও কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। এমনকি পাশেই আনসার ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেউ এই পাশবিক হত্যাযজ্ঞে হস্তক্ষেপ করেননি। ভিডিওতে হামলাকারীদের একজনকে জনতাকে উদ্দেশ্য করে হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে কিছু বলতেও শোনা যায়। এই নীরবতা বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। এই বর্বরতার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *