‘অযোগ্য বাবা’-র অপমানের জ্বালা নাকি মানসিক বিকার? টেনিস তারকা রাধিকাকে খুন দীপকের

২৫ বছর বয়সী তরুণী রাধিকা যাদব, গুরুগ্রামের উদীয়মান টেনিস খেলোয়াড়। বৃহস্পতিবার সকালে বাবার হাতে তাঁর নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল আত্মীয়স্বজন নয়, গোটা দেশকেই স্তম্ভিত করে দিয়েছে। অসংখ্য পদক আর একরাশ প্রশ্ন রেখে রাধিকা চলে গেলেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। যে বাবা নিজের সব শখ বিসর্জন দিয়ে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেয়ের জন্য টেনিস অ্যাকাডেমি গড়েছিলেন, তিনিই কেন নিজের মেয়েকে গুলি করে মারলেন? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মনে।
এক অদম্য পিতৃত্বের উল্টো পিঠ
রাধিকার টেনিস ক্যারিয়ার যখন চোটের কারণে প্রায় শেষের পথে, তখনই দেবদূতের মতো পাশে দাঁড়ান বাবা দীপক যাদব। তাঁরই পরামর্শে রাধিকার ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি অত্যাধুনিক অ্যাকাডেমি তৈরি হয়। এমনকি, এক বছর আগে রাধিকা যখন একটি মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন, তখন দীপক নিজে তাঁকে সেটে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং ১১ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে মেয়ের কাজ শেষে তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিলেন। এসব তথ্যই প্রাথমিক সন্দেহের কুয়াশা আরও বাড়িয়ে তুলছে। আপাতদৃষ্টিতে, দীপকের এই আচরণে মেয়ের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা এবং সমর্থনের ছবিই ফুটে ওঠে।
তাহলে খুনের মোটিভ কী? এই প্রশ্নই ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের।
অপমানের বিষ: ‘গিরা হুয়া বাপ’ মন্তব্যের নেপথ্যে কি মানসিক বিকার?
প্রাথমিকভাবে যেসব তথ্য সামনে আসছে, তার কোনোটি দিয়েই খুনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। তবে সূত্র বলছে, তদন্তকারীদের অনুমান, দীপক মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানা গেছে, দীপক অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ এবং রাগী স্বভাবের ছিলেন। এমনকি, স্ত্রীর সঙ্গে ভাইয়ের সাধারণ কথাবার্তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলতেন।
পুলিশের তদন্তে খুনের মূল কারণ হিসেবে একটি ‘অপমানবোধ’ উঠে এসেছে। কিন্তু কে অপমান করল? কী এমন কথা কানে গেল, যা দীপককে নিজের মেয়েকেই হত্যা করার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল?
ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, সম্প্রতি দীপক তাঁর পৈতৃক গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন নাকি তাঁকে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “তুই একটা গিরা হুয়া বাপ” অর্থাৎ মেয়ের টাকায় চলা অযোগ্য বাবা। এই মন্তব্য দীপক নাকি কিছুতেই সহ্য করতে পারেননি।
তিন দিনের নীরব জ্বালা এবং ভয়ংকর পরিণতি
গ্রাম থেকে ফিরে আসার পর দীপক রাধিকাকে অ্যাকাডেমি বন্ধ করে দিতে বলেন। স্বাভাবিকভাবেই রাধিকা এতে অবাক হন এবং বাবাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনিই নিজ উদ্যোগে অ্যাকাডেমি খুলে দিয়েছিলেন, তাই হঠাৎ বন্ধ করার কোনো অর্থ হয় না। রাধিকার এই উত্তরে দীপক আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
পুলিশের দাবি, এই ঘটনার পর তিন দিন ধরে দীপক ভেতরে ভেতরে রাগে ও অপমানে জ্বলছিলেন। প্রথমে নাকি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, সেই জমে থাকা রাগ এবং অপমানের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে তিনি নিজের মেয়েকেই হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার দিন সকালে, স্ত্রী মঞ্জু যাদব অসুস্থ ছিলেন এবং ছেলে ছিল বাড়ির বাইরে। রাধিকা রান্নাঘরে একা ছিলেন। তখনই দীপক হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়েন এবং নিজের লাইসেন্সপ্রাপ্ত .৩২ বোরের রিভলভার দিয়ে রাধিকাকে লক্ষ্য করে পর পর গুলি চালান। চারটি গুলি রাধিকার গায়ে বিদ্ধ হয় এবং ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাধিকার কাকা কুলদীপ যাদব থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর পুলিশ দীপকের রিভলভার বাজেয়াপ্ত করেছে এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছে। রাধিকার মেডেলগুলো আজ স্তব্ধ নীরবতায় দীপকের মানসিক স্থিতি এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের জটিল মনস্তত্ত্বের দিকেই ইঙ্গিত করছে। পুলিশ এখন এই পারিবারিক বিয়োগান্তক গল্পের প্রতিটি স্তর উন্মোচন করার চেষ্টা করছে।