“হেমা মালিনীকে ব্রজ থেকে তাড়াব…”-বাঁকে বিহারী করিডরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জনগণের

মথুরা থেকে বিজেপির টিকিটে পরপর তিনবার সাংসদ নির্বাচিত প্রবীণ অভিনেত্রী হেমা মালিনী এবার নিজ নির্বাচনী এলাকাতেই প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘ব্রজভূমি থেকে তাড়িয়ে দাও’ স্লোগান তুলেছেন স্থানীয় মহিলারা। এই বিতর্কের মূল কারণ হলো বৃন্দাবনে প্রস্তাবিত বাঁকে বিহারী করিডর প্রকল্প। গত ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বৃন্দাবনের স্থানীয় বাসিন্দা, পুরোহিত এবং গোস্বামী সম্প্রদায়ের মহিলারা এই উন্নয়ন প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের ফলে ব্রজভূমির পবিত্রতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। আর এই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে স্থানীয় বিজেপি সাংসদ হেমা মালিনীর একটি মন্তব্য।

সম্প্রতি হেমা মালিনীর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “আমরা এই করিডর তৈরি করবই। যারা বিরোধিতা করবে, তাদের বলব অন্য কোথাও চলে যান। বৃন্দাবনে থাকতে না চাইলে এখান থেকে চলে যেতে পারেন।” এই মন্তব্য স্থানীয়দের ক্ষোভকে চরমে নিয়ে গেছে।

স্থানীয় মানুষের তীব্র প্রতিবাদ: ‘হেমা মালিনী বাইরের, তাঁর ব্রজে থাকার অধিকার নেই!’
হেমা মালিনীর এই মন্তব্যে মথুরা এবং বৃন্দাবনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তার পদত্যাগের পাশাপাশি মথুরা থেকে তাকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। গোস্বামী সম্প্রদায়ের মহিলারা সরাসরি বলেছেন, “এ বার আমরা হেমা মালিনীকে ব্রজ থেকে তাড়িয়ে দেব। আমরা ব্রজবাসী, ব্রজেই থাকব। হেমা মালিনী বাইরের, তাঁর ব্রজে থাকার কোনো অধিকার নেই।” এই মন্তব্য থেকেই স্থানীয়দের তীব্র আবেগ এবং বিরক্তি স্পষ্ট।

তীর্থযাত্রীদের বৃন্দাবনে আরও সহজে যাতায়াত করার সুবিধার জন্য বাঁকে বিহারী করিডর প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ করিডরের আদলে তৈরি হবে। তবে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, এই করিডরের জেরে ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলিকে তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে। শুধু তাই নয়, তারা আশঙ্কা করছেন যে, এই প্রকল্প ওই এলাকার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যও ধ্বংস করে দেবে।

গত ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় মানুষ রীতিমতো শিবির তৈরি করে এই করিডর তৈরির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। এই প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মূলত গোস্বামী সম্প্রদায়ের মহিলারাই। তারা সাফ জানিয়েছেন, করিডর নির্মাণ করতে হলে তাদের মৃতদেহের উপর দিয়েই করতে হবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও হেমা মালিনীর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ। তারা মনে করছেন, তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শহরের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করবেন, এই আশাতেই হেমা মালিনীকে মথুরা থেকে তিনবার নির্বাচিত করা হয়েছিল। অথচ এখন তিনি উল্টো তাদেরই সেখান থেকে চলে যেতে বলছেন।

এমনকি বাঁকে বিহারী মন্দিরের পুরোহিতরাও হেমা মালিনীর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। পুরোহিত জ্ঞানেন্দ্রকিশোর গোস্বামী বলেছেন, “ভগবান কৃষ্ণের নিজস্ব ধরনে মানুষকে শিক্ষা দেন। আমাদের ব্রজভূমি ছেড়ে চলে যেতে বলার সময়ে হেমাজির মনে রাখা উচিত ছিল, দেবরাজ ইন্দ্রকেও শিক্ষা দিয়েছিলেন শ্রী কৃষ্ণ।” আরেক পুরোহিত রসিকবিহারী গোস্বামী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “করিডর নির্মাণের পরিকল্পনায় যাদের ক্ষতি হবে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে কখনও আসেননি তিনি। কিন্তু এত উদ্ধতভাবে আমাদের চলে যেতে বলেছেন। সরকার ধনীদের স্বার্থে কাজ করছে। আদি বাসিন্দাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে।”

চর্তুদিকে চাপে হেমা: সুর নরম, ভিডিওটি ‘নির্বাচন পূর্ববর্তী’ বলে দাবি
চতুর্দিক থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে হেমা মালিনী এখন সুর নরম করেছেন। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর কাছে তিনি দাবি করেছেন, ভাইরাল ভিডিওটি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে রেকর্ড করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, বিভেদ তৈরির লক্ষ্যে ইচ্ছা করে এই ভিডিও ক্লিপটি জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি স্পষ্ট করেছেন, সুপ্রিম কোর্ট সম্মতি দিলে তবেই করিডরটি নির্মাণ করা হবে এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে, সকলের স্বার্থ রক্ষা করেই এটি তৈরি করা হবে। তিনি আরও বলেন, “মথুরা আমার কর্মভূমি। আমি ভগবান কৃষ্ণের সেবা করতে এসেছি এখানে। ব্রজবাসীকে আমি আমার পরিবারের অংশ বলে মনে করি।”

এই ঘটনা আগামী দিনে মথুরার রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *