“ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধ হবে বোমার মতোই ভয়ঙ্কর”-জিনপিং কে হুঁশিয়ারি অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রীর

তিব্বত, ভারত এবং বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর চীনের মেগা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু। বুধবার প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রকল্পকে অরুণাচলের জন্য “বোমার মতোই ভয়ঙ্কর” আখ্যা দিয়েছেন, যা সামরিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি কিছু বলে তাঁর মত।

মুখ্যমন্ত্রী খাণ্ডু সতর্ক করে বলেছেন, “চীনের এই প্রকল্প শেষ হলে তা আমাদের জীবন-জীবিকার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে।” তাঁর আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক জলচুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় চীনকে বিশ্বাস করা কঠিন। ভরা বর্ষা মৌসুমে তারা যদি পরিকল্পিতভাবে বাঁধের ‘লক গেইট’ খুলে দেয়, তাহলে অরুণাচলের টুটিং, ইঙকিয়াং, পাসিঘাট-সহ একাধিক শহর বিশাল জলের ঢলে ভেসে যেতে পারে, এমনকি বহু এলাকার অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস হিমালয়ের কৈলাস পর্বতের মানস সরোবর, যা বর্তমানে চীনের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ তিব্বতে অবস্থিত। তিব্বতে এই নদের নাম ‘ইয়ারলুঙ্ক সাংপো’। এরপর এটি ভারতের অরুণাচলে ‘সিয়াং’ নামে প্রবেশ করে এবং আসামে ‘ব্রহ্মপুত্র’ নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়।

২০২১ সালে তিব্বত সফরে গিয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এই বিশাল বাঁধ প্রকল্পের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সরকারিভাবে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়ারলুংক সাংপো বাঁধ’। লি কেকিয়াং সেই সময় দাবি করেছিলেন, এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ হবে।

এই বাঁধ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। চীনা প্রকৌশলীদের তথ্য অনুযায়ী, ইয়ারলুঙ্ক সাংপো নদের এই বাঁধের ওপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে তা থেকে প্রতিদিন ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২০২৪ সালে বেইজিং ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে, যা এর আগে বিশ্বের আর কোনও একক প্রকল্পে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাঁধটি নদের নিম্ন উপত্যকায় ভারত সীমান্তের অনতিদূরেই তৈরি করা হচ্ছে।

ভারতের উদ্বেগ ও চীনের নীরবতা
গত কয়েক বছরে অরুণাচলে ‘সিয়াং’ বা ব্রহ্মপুত্রের জলের স্তরের অস্বাভাবিক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে, যার জন্য নয়াদিল্লি চীনের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকে দায়ী করে আসছে। যদিও বেইজিং বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তিব্বতের অবস্থান উজানে হওয়ায় এই বাঁধ নির্মাণ হলে শুধুমাত্র অরুণাচল প্রদেশ নয়, ভারত ও বাংলাদেশের নদীতীরে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জীবনে নদীর প্রবাহ শুকিয়ে যাওয়ারও মারাত্মক আশঙ্কা রয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু তাঁর সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, “সমস্যা হলো, চীন আন্তর্জাতিক জলচুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। এ কারণেই চীনকে বিশ্বাস করা যায় না। কেউই জানে না যে তারা কী করতে পারে।” এনডিটিভি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এই মেগা প্রকল্প একদিকে যেমন চীনের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে, তেমনি অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই বাঁধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা এবং সমাধানে পৌঁছানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Editor001
  • Editor001

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *