চিকিৎসক নিগ্রহ কাণ্ডে উত্তাপ, পুলিশি তলবে সাড়া দিলেন না কৌস্তভ বাগচী, সি.সি.টি.ভি ফুটেজে ‘তৃণমূলের চক্রান্তে’র দাবি!

চিকিৎসককে হুমকি ও মারধর কাণ্ডে তলব সত্ত্বেও পুলিশি হাজিরা এড়িয়ে গেলেন বিজেপির আইনজীবী নেতা কৌস্তভ বাগচী। শুক্রবার সকাল ১১টায় মোহনপুর থানায় তাঁকে তলব করা হলেও, পূর্ব নির্ধারিত কাজের অজুহাত দেখিয়ে পাল্টা চিঠি দিয়ে সময় চেয়ে নিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজকে হাতিয়ার করে তিনি এই ঘটনার পেছনে তৃণমূলের ‘ষড়যন্ত্র’ রয়েছে বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন।

পুলিশি তলবে কৌস্তভের ‘না’:

মোহনপুর থানার পক্ষ থেকে বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচীকে নোটিস পাঠিয়ে শুক্রবার নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে, সেই তলবে সাড়া না দিয়ে কৌস্তভ পুলিশের কাছে পাল্টা চিঠি পাঠিয়ে জানিয়েছেন, আগে থেকেই তাঁর একাধিক পূর্ব নির্ধারিত কাজ থাকায় এত অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর পক্ষে থানায় হাজিরা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও জানিয়েছেন, তাঁকে পুনরায় সময় জানিয়ে নোটিস দেওয়া হলে তিনি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন।

যদিও পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, শুক্রবার নির্দিষ্ট সময়ে কৌস্তভ বাগচী হাজিরা না দেওয়ায় ব্যারাকপুর কমিশনারেট ফের তাঁকে তলব করার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

কৌস্তভের পাল্টা দাবি: ‘তৃণমূলের ষড়যন্ত্র’ ও সিসিটিভি ফুটেজ:

চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিগ্রহ এবং হুমকির ঘটনায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কৌস্তভ বাগচী এবার বেসরকারি ওই হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজকে হাতিয়ার করেছেন। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ পোস্ট করে তিনি দাবি করেছেন যে, চিকিৎসক নিগ্রহের নেপথ্যে তৃণমূলের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তাঁর এই দাবির সত্যতা তুলে ধরতে তিনি তৃণমূলের এক কর্মীর ছবিও সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন।

কৌস্তভের অভিযোগ, “ঘটনার সময় ব্যারাকপুর পুরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কর্মী মিন্টু বেসরকারি হাসপাতালে হাজির ছিলেন। তিনিই ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসককে চড় মারেন। সেই সময় আমি ওই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তখনই সে পরিকল্পিতভাবে এই কাণ্ড ঘটায়। সিসিটিভি ফুটেজে সেই চড় মারার দৃশ্য ধরা পড়েছে।” তিনি আরও দাবি করেছেন, “ওই তৃণমূল কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর দেবু মজুমদার এবং ব্যারাকপুরের বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর। তৃণমূল কর্মী চড় মারল, আর দোষ হল কৌস্তভ বাগচীর?”

এই ইস্যুতে তিনি তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিককেও একহাত নিয়েছেন।

পার্থ ভৌমিকের অভিযোগ ও কৌস্তভের পাল্টা জবাব:

ঘটনাক্রমে, পার্থ ভৌমিক ওই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে নাম না করে কৌস্তভ বাগচীকে নিশানা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “রোগীমৃত্যু নিয়ে যদি কোনো চিকিৎসকের গাফিলতি থাকত, তাহলে তো রোগীর পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করত! অন্য কাউকেও জানাত। কিন্তু, রোগীর পরিবার কোথাও অভিযোগ করল না। কোথা থেকে একজন এসে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর, হেনস্তা করে নিজেকে বড় জাহির করতে চাইল।” পার্থ ভৌমিক আরও বলেছিলেন, “আসলে চিকিৎসকরা যাতে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে না পারে সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি আশা করব চিকিৎসকেরা যাতে নিরাপদে পরিষেবা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করবে পুলিশ-প্রশাসন। যিনি এই গুন্ডামি করলেন তার দল এখানে উত্তরপ্রদেশের সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে। বাংলার মানুষ গোবলয়ের এই অসভ্যতা মানবে না।”

পার্থ ভৌমিকের এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়ে কৌস্তভ ইটিভি ভারতের প্রতিনিধিকে বলেন, “রোগীর পরিবার অভিযোগ করেছে না করেনি, সেটা আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেখলেই বুঝতে পারবেন। পার্থ ভৌমিক নাটক করতে করতে বড় অভিনেতা হয়ে গিয়েছে। উনি এত মিথ্যা কথা বলেন, কোনো ভদ্রলোকও এত মিথ্যা বলেন না।” তিনি আরও দাবি করেন, “আসলে নিজেদের দোষ ধামাচাপা দিতে আমার উপর দায় চাপানো হচ্ছে। যে চড় মেরেছে সে তো তৃণমূল কর্মী। ভিডিও দেখলেই বোঝা যাবে। ডাক্তার নিজে বলছেন আমি কোনো মারধর কিংবা গালিগালাজ করিনি। এসব নাটক মানুষ ধরে ফেলেছে। এর যোগ্য জবাব মানুষই দেবে।”

চক্রান্ত করে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তরে কৌস্তভ বলেন, “এসব চক্রান্ত করে আমাকে কিছু করতে পারবে না। ওসব চক্রান্ত কীভাবে সামাল দিতে হয়, তা আমার ভালো করেই জানা আছে।”

প্রসঙ্গত, গত ১লা জুলাই চিকিৎসক দিবসে এক বিজেপি কর্মীর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে ব্যারাকপুর মোহনপুর সংলগ্ন ওই বেসরকারি হাসপাতালে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, এর পরেই হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেন বিজেপি নেতা ও আইনজীবী কৌস্তভ বাগচী। এমনকি, আঙুল উঁচিয়ে শাসানি এবং চিকিৎসকদের নিগ্রহ করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও কৌস্তভ সেই ‘দাদাগিরি’ কিংবা ‘শাসানি’র অভিযোগ মানতে চাননি। উল্টে, ঘটনার সময় তিনিই পরিস্থিতি সামলেছেন বলে দাবি করেছেন। কৌস্তভ বাগচীর সেই ‘শাসানি’র ভিডিও ভাইরাল হতেই বিভিন্ন মহলে শোরগোল পড়ে যায়। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের তরফে রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বাস্থ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার আবেদন জানানো হয়। উত্তর ২৪ পরগনা প্রগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের চার সদস্যের প্রতিনিধিদলও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার বার্তা দেন।